বিশেষ প্রতিবেদন

সিলেটে ১০০ রুটে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক · শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ · রাত ১২:২১ · ১৭৩ ভিউ

সিলেটের সীমান্ত মানেই পাহাড়, ঝরনা আর মেঘের মিতালী। কিন্তু এই মায়াবী নিসর্গের আড়ালেই এখন চলছে এক ভয়ঙ্কর মরণখেলা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ আর সীমান্তের ‘শত ছিদ্র’ দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে চুইয়ে পড়ছে ভারতীয় অবৈধ অস্ত্র, মাদক আর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক। সিলেটের পাঁচ উপজেলার অন্তত একশটি পয়েন্ট এখন পরিণত হয়েছে বারুদের করিডোরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয়ের চুনাপাথর খনিতে ব্যবহৃত ‘পাওয়ার জেল’ এবং ‘ইলেকট্রিক ও নন-ইলেকট্রিক ডেটোনেটর’ এখন সীমান্ত পার হয়ে অবাধে ঢুকছে বাংলাদেশে। জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে আছে সিন্ডিকেটের জাল। সাম্প্রতিক সময়ে র‍্যাব ও বিজিবির অভিযানে উদ্ধার হওয়া বেশিরভাগ বিস্ফোরকই ভারতের ‘অ্যামিন এক্সপ্লোসিভ প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তৈরি। গোয়াইনঘাটের সংগ্রামপুঞ্জি থেকে শুরু করে জৈন্তাপুরের আলুবাগান কিংবা জকিগঞ্জের আমলশীদ—সবখানেই একই চিত্র।

র‍্যাব-৯-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কেজি ৭৩০ গ্রাম বিস্ফোরক এবং ২ শতাধিক ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়েছে। এর সাথে আছে দেশি-বিদেশি ৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও শতাধিক রাউন্ড গুলি। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এয়ারগানকে পরিবর্তন করে তৈরি করা ‘ওয়ান শ্যুটার গান’। পাহাড়ের নিভৃত কোণে বা লোকচক্ষুর আড়ালে সাধারণ এয়ারগানকে মরণাস্ত্রে রূপান্তর করছে অপরাধী চক্র।

প্রশ্ন উঠেছে, বিপুল এই বিস্ফোরক ও অস্ত্রের গন্তব্য কোথায়? র‍্যাব-৯-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার মো. তাজমিনুর রহমান চৌধুরীর মতে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এগুলোর একটি বড় অংশ পাথর ক্রাশার মেশিনে বড় পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে নাশকতার আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দিচ্ছে না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু ট্রাজেডি হলো, অভিযানে যারা ধরা পড়ছে তারা নেহায়েতই ‘বাহক’। সীমান্তের ওপার থেকে এপারে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য সামান্য টাকার বিনিময়ে কাজ করে এরা। পর্দার আড়ালে থাকা মূল হোতারা বা ‘ক্রস বর্ডার’ চক্রের কুশীলবরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সিলেটের তিন দিকই ভারত সীমান্তঘেরা। উত্তরে মেঘালয়, দক্ষিণে ত্রিপুরা আর পূর্বে আসাম। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। শুধু অস্ত্র বা মাদক নয়, এই পথগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে মানবপাচারের রুট হিসেবেও। সিলেটের সচেতন মহল ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোরতা না বাড়ালে জননিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি মো. আবদুল জব্বার জলিল আক্ষেপ করে বলেন, সীমান্তে নিশ্চয়ই কোনো দুর্বলতা আছে, যার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। এই চক্রের শেকড় উপড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি।

শান্ত পাহাড়ের বুক চিরে আসা এই বারুদের গন্ধ সিলেটের জনপদকে ক্রমেই ভাবিয়ে তুলছে। এখন প্রশ্ন একটাই—কবে বন্ধ হবে সীমান্তের এই মরণখেলা?

সম্পর্কিত সংবাদ