মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকে, আর সেই কর্ম যদি হয় সততা এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল, তবে তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের আলোকবর্তিকা। হবিগঞ্জের নিভৃত পল্লী থেকে উঠে এসে বাংলাদেশ পুলিশের একজন সফল ও আদর্শ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তাঁর জীবনগল্প কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত উত্থান নয়, বরং এটি প্রতিকূলতাকে জয় করে উপরে ওঠার এক অদম্য অনুপ্রেরণা।
শৈশব ও সংগ্রামের মেঠোপথ
আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর আগে, ১৯৭২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লুকরা ইউনিয়নের ‘ফান্দ্রাইল’ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। পিতা মরহুম সৈয়দ কছিরুল হোসাঈন ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক এবং মাতা সৈয়দা রাবেয়া খাতুন ছিলেন আদর্শ গৃহিণী।
তৎকালীন সময়ে ফান্দ্রাইল গ্রাম ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন এক অজ পাড়াগাঁ। বর্ষায় দিগন্তজোড়া পানি আর শুকনা মৌসুমে কর্দমাক্ত পথই ছিল নিয়তি। এমন পরিবেশ থেকেই তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। গ্রামের পাঠশালা শেষ করে ১৯৮৩ সালে যখন তিনি আষেড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন, তখন প্রতিদিন চার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তাঁকে স্কুলে যাতায়াত করতে হতো। ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাঁকে তাড়িত করে।
নৌকায় করে ৭ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিয়ে কোর্ট স্টেশন থেকে বেকিটেকা বাজারে যাতায়াত করতে হতো। প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি দমে যাননি; মেধার স্বাক্ষর রেখে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অর্জন করেছিলেন কৃতিত্বপূর্ণ দ্বিতীয় স্থান। পরবর্তীতে হবিগঞ্জের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি।
কনস্টেবল থেকে পুলিশ পরিদর্শক
১৯৯২ সালে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সাধারণ কনস্টেবল পদে যোগদান করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। শুরুটা সাধারণ হলেও তাঁর একাগ্রতা ছিল অসাধারণ। সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর তাঁর নিষ্ঠা তাঁকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়। ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে বদলি হওয়ার পর তাঁর কর্মদক্ষতা উর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে তিনি আজ বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর (ওসি) পদে আসীন। সিলেট মহানগর ডিবি থেকে শুরু করে বর্তমানে সিলেট মেট্রোপলিটন কোর্টে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রমাণ করেছেন, মেধা ও সততা থাকলে একটি সাধারণ পদ থেকেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সততা যার চরিত্রের ভূষণ
সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর প্রশ্নাতীত সততা। এমন এক পেশায় যেখানে প্রলোভন অনবরত হাতছানি দেয়, সেখানে তিনি নিজেকে রেখেছেন নিষ্কলঙ্ক। তিনি মনে করেন, পুলিশের ইউনিফর্ম কেবল একটি পোশাক নয়, এটি জনগণের আমানত। অর্থের পাহাড় গড়ার সুযোগ থাকলেও তিনি সেই পথে হাঁটেননি। তাঁর এই স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণে সরকার ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে তিনি একাধিকবার সম্মাননা স্মারক ও প্রশংসাপত্র লাভ করেছেন। তাঁর সহকর্মীদের কাছে তিনি একজন ‘ক্লিন ইমেজের’ অফিসার হিসেবে সমাদৃত।
আওলাদে রাসূল (সা.) ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার
সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশের রক্ত। তিনি হযরত আলী (আ.) ও মা ফাতেমা (আ.)-এর বংশধর (আওলাদে রাসূল)। তাঁর বংশীয় সিলসিলা সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র.) হয়ে সরাসরি মহানবী (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারই তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তার মূল ভিত্তি।
পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিনি তাঁর প্রৌ-পিতা সৈয়দ এক্রাম হোসেন ও দাদা সৈয়দ আহম্মদ হোসেনের মাজার শরীফ আধুনিকায়ন ও সংস্কার করেছেন। আধ্যাত্মিকতার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর রচিত ‘কাছিদায়ে শাহেন শাহ্’ নামক বিশাল গ্রন্থে। তিনি সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের বহু প্রখ্যাত পীর-মাশায়েখ ও আধ্যাত্মিক সাধকদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন।
আর্তমানবতার সেবক ও একজন সফল পিতা
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই উচ্চশিক্ষিত পুত্রের জনক, যাদেরকে তিনি মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেন। তাঁর কাছে আসা কোনো অসহায় মানুষ কখনো খালি হাতে ফিরে যায় না। বিনয়ী এই মানুষটি সবসময় বলেন, ‘আমি কেবল উছিলা, সাহায্য করার মালিক একমাত্র আল্লাহ।’ কোমলমতি শিশুদের সাথে আড্ডা দেওয়া এবং খেলাধুলা করা তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ।
শেষ ইচ্ছা ও জীবনদর্শন
সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের শেষ ইচ্ছা অত্যন্ত নির্মল। তিনি জীবনের বাকি সময়টুকু মানবকল্যাণে এবং ওলি-আউলিয়াদের সেবায় উৎসর্গ করতে চান। মক্কা-মদিনা ও কারবালার পবিত্র ভূমি জিয়ারত এবং হজ্জ পালন করার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শকে ধারণ করে ঈমানের সাথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাই তাঁর জীবনের একমাত্র প্রার্থনা।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আজ কেবল একজন সফল পুলিশ অফিসার নন, তিনি এক সংগ্রামী জীবনের নাম। হবিগঞ্জের ফান্দ্রাইল গ্রামের সেই মেঠোপথ থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই যাত্রা আজ তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সততা, বংশীয় আভিজাত্য আর আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন তাঁর জীবন, যা আমাদের শেখায়—সততাই প্রকৃত বিজয়।
