মো. ইসলাম আলী
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের গোসাইনপুর গ্রামের আহমদ আলীর (লেংড়া আহমদ) ছেলে মাসুক আহমদ। সাত ভাইদের মধ্যে সে সবার বড়। একসময় পরিবারের নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। অবস্থা এতো খারাপ ছিল মাসুক কচু-লতা বাজারে বিক্রি করে পরিবার চলাত।মাসুক আহমদ কিছুটা বয়সে বড় হওয়ার পর সে দীর্ঘদিন মানুষের হাস রাখাল হিসেবে কাজ করে। এভাবে চলে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চলে মাসুক। কিছুটা বড় হয় অন্যান্য ভাইয়েরাও। তখন ছোট ভাই সুজুক আহমদ ও সে নিজে সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতো। ভাড়ায় চালিত অটোরিকশা থেকে দুই ভাই মিলে যা আয় করতেন তা দিয়ে মোটামুটি চলত তাদের পরিবার।
হঠাৎ করে ২০১৪ সালে ভাগ্যের চাকা খুলে সিএনজি অটোরিকশা চালাক মাসুক উদ্দিনের। ২০১৪ সালের স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার প্রহসনের নির্বাচনের সময় মাসুক আহমদ নিজেকে যুবলীগ নেতা হিসাবে পরিচয় দেয়া শুরু করেন। নেতাদের পিছে পিছে ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায় তাকে যত্রতত্র। নিজ দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তাকে হাইব্রিড নেতা উপাধি প্রদান করেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তেমন নেতাদের পিছনে ঘুরে তেমন কিছু ভাগিয়ে নিতে পারেননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জোট বদ্ধ হয়ে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে শুরু হয় বিরোধী মতে দমন-পীড়ন। তখন স্থানীয় বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়েরে তার ভূমিকা ছিল সর্বাগ্রে। এইসব মামলা বাজিতে সে এতো আগ্রহী হয় যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সকলের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। এই সুবাদে ২০১৮ সালের নির্বাচন পরবর্তী ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লুটপাটের প্রকল্প মুজিব বর্ষের উপহারের ঘরের টেন্ডার আসে।
তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিদুল রহমান তাকে টেন্ডার দিলে নিজেরও অনেক ফায়দা হবে এমন চিন্তায় গোয়াইনঘাট উপজেলার ঘরগুলোর টেন্ডার প্রদান করেন। এই যেন তার ভাগ্যাকাশে নতুন চাঁদ উদিত হয়। ৪৫০-৫০০টি ঘর নির্মাণ করতে মাসুক আহমদ হয়ে উঠে প্রায় ১০কোটি টাকার মালিক। এই সব ঘরকে এত নিম্নমানে তৈরি করা হয়েছে যে মাত্র দুই তিন বছরের ভিতরে বেশিরভাগ ঘর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।
মাসুক আহমদের গ্রামে খুঁজ নিয়ে জানা যায়, যার একটি ঘর নির্মাণ করার মত জায়গা ছিল না, সে মাত্র ৩-৪ বছরের ব্যবধানে অনেক বড় জমিদার। ভবিষ্যতে সরকারি কোন সংস্থা যাতে তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে না পারে সে জন্য চতুর মাসুক কৌশলে এসব জমি তার বাবা, স্ত্রী, ভাই, বোনসহ অন্যদের নামে রেজিস্ট্রি করে। এবং অল্পকিছু নিজের নামেও রেজিষ্ট্রি করেছে।
৪ বছর আগে যার মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, সে এখন স্থানীয় বিন্নাকান্দি বাজারে দুতলা মার্কেটের মালিক। খাস জায়াগা ও ছাড়ার উপর এই মার্কেট নির্মাণ করে দখলবাজ মাসুক। তাছাড়া তার রয়েছে বিশাল বাগান বাড়ি ও কোটি টাকার খামার।
এলাকাবাসীর বর্ণনামতে, ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর থেকে প্রায় সপ্তাহখানেক মাসুক আহমদকে রাস্তাঘাটে বের হতে দেখা যায়নি। এমনকি তার বাড়ির মেইনগেট ছিল তালাবদ্ধ। বাজারের পূর্ণ বিল্ডিং ছিল বন্ধ। সদ্য থাকে বের হতে দেখা গেলেও তার খামারের গরু সহ অন্যান্য প্রাণীগুলো গাড়ি দিয়ে স্থানান্তর করতে দেখা গেছে। অনেক সম্পদ বাড়ি থেকে গাড়ি দিয়ে বাহিরে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। অনেকে ধারণা করছেন যে, মাসুক আহমদ হয়ত বাহিরে কোথাও পলায়ন করবে।
টেন্ডারবাজী ছাড়াও মাসুক আহমদ এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে মামলার দেওয়ার ভয় দেখিয়ে সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন। এলাকায় তার নির্যাতনের শিকার অনেকে মনে করেন তাকে যেন প্রশাসন দেশের বাহিরে যেতে না দেয়।
এছাড়া ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ফতেপুর বাজারে মিছিল বের করেলে মাসুক উদ্দিন তাৎক্ষনিক পুলিশ দিয়ে বাজারে মহাড়া দেয়। এবং যারা মিছিল বের করেছিল তাদের লিস্ট প্রশাসনের নিকট প্রদান করেছিল।
এলাকাবাসী স্থানীয় প্রশাসন, দুদুক এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তার সম্পত্তির হিসেব নেয়ার জন্য এবং তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করার জন্য।
এ ব্যাপারে যুবলীগ নেতা মাসুক আহমদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
Leave a Reply