তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন
অনলাইন ডেস্ক
তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে যেন বইছে ‘থালাপতি-ঝড়’। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা দাপট দেখাচ্ছেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা দক্ষিণী সুপারস্টার বিজয় থালাপতির দল ‘তামিলাগা ভেটরি কাজাগম’ (টিভিকে)। মাত্র দুই বছর আগে গঠিত দলটির একক ঝড়েই বড় ধাক্কা খেয়েছেন বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজের শক্ত ঘাঁটি কোলাথুরেই মুখ থুবড়ে পড়েছেন স্ট্যালিন।
প্রতিদ্বন্দ্বী টিভিকের প্রার্থী ভি এস বাবুর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হোঁচট খেয়েছেন তিনি। সকালেই সামাজিক মাধ্যমে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ পরিচয় সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা তৈরি হয়, আর দিনের শেষে সেই জল্পনাই যেন বাস্তবে রূপ নিল।
গণনার হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে) একের পর এক আসনে এগিয়ে গিয়ে ম্যাজিক ফিগার ১১৮-এর দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। অন্যদিকে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম (ডিএমকে) ও অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম (এআইএডিএমকে)-এর বহু আসন হাতছাড়া হওয়ার মুখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর ভোটার এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—পুরনো সমীকরণ ভেঙে নতুন নেতৃত্ব চাচ্ছেন তারা। ফলে দশকের পর দশক ধরে চলা ডিএমকে-এআইএডিএমকে দ্বিমেরু রাজনীতি কার্যত ভাঙনের মুখে।
প্রথম লড়াইতেই বাজিমাতের পথে বিজয়
দ্য হিন্দুর বরাতে ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমবার ভোটের ময়দানে নেমেই চমক দেখাচ্ছেন সি. জোসেফ বিজয়। প্রচারে নিজেকে ‘প্রতিটি তামিল পরিবারের সদস্য’ হিসেবে তুলে ধরা, আর ‘হুইসেল রেভল্যুশন’-এর ডাক—দুই মিলিয়ে তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের বড় অংশকে নিজের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
এককভাবে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত ছিল বড় ঝুঁকি। তবু কোনো জোটে না গিয়ে বিজেপিকে ‘আদর্শগত শত্রু’ এবং ডিএমকেকে ‘রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী’ ঘোষণা করে আলাদা অবস্থান তৈরি করেন তিনি। সেই কৌশলই এখন ফল দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
থালাপতির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যা আছে
থালাপতির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে : স্নাতকদের জন্য মাসে ৪ হাজার রুপি ভাতা, নারীদের জন্য ২ হাজার ৫০০ রুপি সহায়তা এবং বিয়ের উপহার হিসেবে সোনা ও শাড়ি। এ ছাড়া সরকারি পরীক্ষাগুলো সময়মতো নেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
তামিল রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়
করুণানিধি ও জে. জয়ললিতার সময় থেকে গড়ে ওঠা দ্বিমেরু রাজনীতির ভিত ছিল বেশ শক্ত। অথচ বিজয়ের একক লড়াইয়েই তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যবাহী দুই দলের অবস্থা নাজুক হয়ে গেল। ফলে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসছে টিভিকে।
জয়ের নেপথ্যে পাশে ছিলেন যে পরামর্শক
থালাপতি বিজয়ের দলের এই জয়ের নেপথ্যে রয়েছেন প্রশান্ত কিশোর। যাকে পাশে পেয়ে দলটি চমৎকারভাবে চমক দেখিয়েছেন।
কে এই প্রশান্ত কিশোর
রাজনৈতিক পরামর্শ থেকে ময়দানের রাজনীতিতে নেমে বড়সড় হোঁচট খান প্রবীণ রাজনৈতিক প্রশান্ত কিশোর। আবার পুরনো পেশায় ফের সাফল্যের শীর্ষে পিকে। নিজের মতো বেহাল হতে দিলেন না বিজয়কে।
রাজনৈতিক পরামর্শদাতা পিকে তার কাজ সুচারুভাবে করেছেন তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে।
তবে ২০২১ সালে বাংলায় তৃণমূলকে জেতানোর পর তিনি সেই কাজটা ছেড়ে বিহারে জন সুরাজ শুরু করেন। শুরুর দিকে তার জনসভা-মিছিলে ব্যাপক ভিড় হচ্ছিল।
সোশ্যাল মিডিয়াতেও চরম জনপ্রিয়তা পান তিনি। কিন্তু ২০২৫ বিহার বিধানসভায় মুখ থুবড়ে পড়ে পিকের সেই দল। ক্ষুরধার রাজনৈতিক মস্তিষ্কের প্রশান্ত হয়তো বুঝে যান, মাঠে নেমে রাজনীতি তাঁর কাজ নয়। বরং পরামর্শ দাতা হিসাবেই বেশি মানায় তাঁকে।
গেল বছর থালাপতি বিজয় অভিনয় ছেড়ে রাজনীতি যোগ দিয়ে দল গঠন করলে তার পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন পিকে।
চমকপ্রদভাবে এক বছরের মধ্যে পোড় খাওয়া রাজনৈতিক মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনকে তামিলনাড়ু মসনদ থেকে হটিয়ে নবাগত টিভিকেকে এনে দিলেন অপ্রত্যাশিত জয়।
বিজয়ের সঙ্গে যোগ দিয়েই লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে নীরবে কাজ শুরু করেন। নিজের রাজনৈতিক সফরে যে যে ভুলগুলি করেছিলেন। সেগুলি বিজয় না করেন, সেটা নিশ্চিত করে দেন প্রশান্ত। তিনি বিজয়কে বুঝিয়ে দেন, শুধু বড়বড় জনসভা করলে হবে না। সংগঠন মজবুত করতে হবে। দলের আদর্শগত জায়গা তৈরি করতে হবে। মানুষের কাছে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে তাঁর রাজনৈতিক ভিশনের। সেই কাজগুলি বিজয় সফলভাবে করেছেন।
তার ফল আজ তামিলের ইতিহাস লেখা হলো নতুন করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার জোর সম্ভাবনা বিজয়ের।
প্রশান্ত অবশ্য এক বছর আগেই বলে দিয়েছিলেন, বিজয়কে তিনি জেতাবেন। গেল বছরের ফেব্রুয়ারির রসিকতা আজ যেন সত্যি হতে চলেছে।
Leave a Reply