সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জে বালু লুট রুখতে সপ্তাহজুড়ে টাস্কফোর্সের সাঁড়াশি অভিযান

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
নিজস্ব প্রতিবেদক · মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ · সন্ধ্যা ৭:২০ · ১৭৬ ভিউ

সুনামগঞ্জের কয়েকটি বালুমহাল ইজারাবিহীন থাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে তাহিরপুরের যাদুকাটা ও দোয়ারাবাজারের মরাচেলা নদীতে দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। শহরতলির ধোপাজান বালুমহালেও নানা কায়দায় বালু উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে টাস্কফোর্সের অভিযান জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। রোববার থেকে শুরু হওয়া এ অভিযান টানা এক সপ্তাহ চলবে। জেলা প্রশাসন বলছে, ইজারাদার না থাকার সুযোগে কোথাও কোথাও বালু উত্তোলনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলার সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি হয়েছে যাদুকাটা ও মরাচেলা বালুমহাল নিয়ে। জেলা প্রশাসন থেকে দূরবর্তী এসব এলাকায় নিয়মিত নজরদারি কঠিন হওয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

সুনামগঞ্জের বড় বালুমহালগুলোর একটি যাদুকাটা নদী। আগের ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগামী ছয় মাসের জন্য এই নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিপরীতে খাস আদায়ের পরিকল্পনা করেছিল জেলা প্রশাসন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এরপর ২০ সেপ্টেম্বর যাদুকাটা-১ মহালের আগের ইজারাদার মাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছির উদ্দিন ১৯৫ দিনের জন্য ইজারা নেওয়ার আবেদন করেন। একই দিনে যাদুকাটা-২ মহালের সাবেক ইজারাদার জিনান এন্টারপ্রাইজের মালিক শাহ্ রুবেলও ইজারার আবেদন করেন।

পরে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব দেওয়ার শর্তে দুটি মহালই নাছির উদ্দিনকে বালু উত্তোলনের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। এই অনুমোদনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন করা হয়।

রিট পিটিশন নম্বর ১৩৮৮০/২৬। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ সেপ্টেম্বর নাছির উদ্দিনকে দেওয়া অনুমোদনপত্র তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। ফলে বর্তমানে যাদুকাটার দুটি বালুমহালই ইজারাবিহীন অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইজারা কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও নদীতে বালু উত্তোলন থেমে নেই। নদীর পাড় কাটার ঘটনাও ঘটছে। এতে নদীভাঙন ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীতেও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় একটি চক্র শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে নদী ও নদীর তীর কেটে বালু তুলছে।

তাদের দাবি, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। এতে নদীর দুই পাড়ের বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও ফসলি জমি ঝুঁকিতে পড়েছে। নদীতীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। রোববার মরাচেলা নদীর কাজিরগাঁও এলাকায়ও মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত নৌকার শ্রমিকদের আটক করা হলেও মূল ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও বালু উত্তোলন শুরু হয়।

সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজান বালুমহালেও অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মহালটির ওপর নজর রাখছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো বালু-পাথরমহালে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে এ ধরনের নজরদারি দেশে প্রথম।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইজারাবিহীন ধোপাজান বালুমহালে কয়েক দফায় ব্যাপক বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা এলাকায় ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা চলতি নদীর প্রবেশমুখে ধোপাজান বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ রক্ষায় ২০১৮ সালে আদালত কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেন।

দীর্ঘদিন উত্তোলন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেখানে আবার বালু উত্তোলন শুরু হয়। পরে প্রশাসনের তৎপরতায় তা বন্ধ হয়। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবর মাসে সরকারি সিদ্ধান্তে কিছুদিন নদীতে বালু উত্তোলন করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে ইজারাবিহীন মহালটিতে নানা কায়দায় বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে।

সুনামগঞ্জে সরকার অনুমোদিত চারটি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে খাসিয়ামারা বালুমহাল নিয়ে বড় কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। তবে চলতি (ধোপাজান), মরাচেলা ও যাদুকাটা বালুমহাল নিয়ে জটিলতা রয়েছে।

সোমবার বালুমহালগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহালের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা। ইজারা শুরুর আগের সময়ে খাস আদায়ের বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি আদালতে রিট করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রিটের পরবর্তী করণীয় বিষয়ে জেলা প্রশাসন সরকারের কাছে নির্দেশনা চেয়েছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ইজারাদার না থাকার সুযোগে কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নেতৃত্বে অভিযান হয়েছে। মরাচেলা এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চলছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্যোগে আগামী এক সপ্তাহ টানা টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, প্রশাসনের কার্যক্রম পরিচালনার সময় তাঁরা দেখেছেন, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল একজন সজ্জন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তিনি স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনিক কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। এ ধরনের মন্তব্যের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের নাম জড়ানোর কোনো অবকাশ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সম্পর্কিত সংবাদ