সুনামগঞ্জ

বনভূমি-কৃষিজমি ছাড়ছে না বালু উত্তোলনকারীরা, সোনালী চেলায় অভিযোগের পাহাড়

ছাতক প্রতিনিধি
ছাতক প্রতিনিধি
প্রতিবেদক · রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ · রাত ৯:২১ · ১৫৮ ভিউ

সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সোনালী চেলা নদীর বালুমহাল ঘিরে ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বনভূমি, কৃষিজমি ও নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে ড্রেজার ও লিস্টার মেশিন ব্যবহার করে বালু ও পলিমাটি উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের একাধিক সরকারি নথিতেও অভিযোগগুলোর উল্লেখ রয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের নথি অনুযায়ী, চেলা নদী ও মরা চেলা নদী নিয়ে গঠিত বালুমহালটির আয়তন ৫৬৬ দশমিক ০৭ একর। বালুমহালটির ইজারামূল্য ১৯ কোটি টাকা। নথিতে মেসার্স জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদের অনুকূলে ইজারা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। উৎসকর ও ভ্যাটসহ মোট পরিশোধের পরিমাণ ২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বলে ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে পাঠানো একটি চিঠিতে ছাতক বিটের আওতাধীন বনভূমিতে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই নথিতে বাহাদুরপুর, রাজেন্দ্রপুর, ইসলামপুর, সৈদাবাদ, নাছিমপুর ও ফায়ারপুঞ্জি মৌজায় মোট ৬ হাজার ১৪১ দশমিক ৯০ একর বনভূমির তথ্য উল্লেখ করা হয়। নথিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে বনভূমি থেকে বালু উত্তোলনের আলামত পাওয়া গেছে। ভাসমান ড্রেজারের মাধ্যমে চেলা ও মরা চেলা নদীসংলগ্ন বনভূমি থেকে বালু উত্তোলনের ফলে বনভূমির মাটি নদীতে বিলীন হয়ে বন ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

একই নথিতে নাছিমপুর মৌজার হাদাটিলা এলাকায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রজাতির ২৫ হাজার চারা রোপণের কথা উল্লেখ করে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে এসব চারা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ছাতক থানা ও নৌ-পুলিশ ফাঁড়িকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অবহিত করা হয়।

এদিকে ১০ জুলাইয়ের আরেক সরকারি নথিতে ছাতকের রাজেন্দ্রপুর মৌজার উবলাচিড়ি, আগুনখালী ও হাতবিল এলাকায় কৃষিজমি থেকে লিস্টার ও ড্রেজার দিয়ে বালু ও পলিমাটি উত্তোলনের অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। ওই অভিযোগে টুটুল মিয়া ও রুবেল আহমদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ইজারাদারকে চেলা ও মরা চেলা নদী থেকে সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলেও শর্ত লঙ্ঘন করে কৃষিজমি থেকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালু ও পলিমাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। নথিতে সংশ্লিষ্ট কৃষিজমির পরিমাণ ১৫০ একর উল্লেখ করা হয়েছে।

১২ জুলাইয়ের আরেক সরকারি নথিতে ছাতকের ১ নম্বর ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজেন্দ্রপুর মৌজার চৈলতার ডালা এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। হাজী জালাল গং এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক, খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ছাতক থানা ও নৌ-পুলিশ ফাঁড়িকে অবহিত করা হয়।

এ ছাড়া বিভাগীয় কমিশনারের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ছাতক উপজেলার পাড়ারপুঞ্জি, রাজেন্দ্রপুর, কাজিরগাঁও, আলমপুর, দারোগাখালী, কলাবাগান, চেলা নদী ও গেদুরঢালা এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার সোনাপুর, পূর্ব সোনাপুর, সারপিনপাড়া ও হাবিবনগরের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে মোহাম্মদ আলী, রফিকুল ইসলাম ও কামরুলসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, গত ২ জুলাই থেকে এসব এলাকায় বালু উত্তোলন চলছে। তবে অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের সংশ্লিষ্টতা ও দায় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ইসলামপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নওশাদ মিয়ার বাগানসংলগ্ন বন বিভাগের জমি ও মরা চেলা নদীর তীর থেকেও বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতা ও সংবাদকর্মীদের কথিতভাবে ‘ম্যানেজ’ করে একটি প্রভাবশালী মহল ড্রেজার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন মহলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা কিংবা সংবাদকর্মীদের কেউ অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত—এমন অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

সোনালী চেলা বালুমহালকে ঘিরে প্রতি ঘনফুট বালুতে ১২ থেকে ১৪ টাকা পর্যন্ত কথিত ‘রয়্যালটি’ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ইজারাকৃত এলাকার বাইরে থেকে উত্তোলিত বালু নদীপথে আনার সময়ও এ অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে উত্তোলিত বালুর ওপর ইজারাদারের কোনো অর্থ আদায়ের এখতিয়ার রয়েছে কি না। এ ধরনের অর্থ আদায়ের কোনো সরকারি অনুমোদন বা ইজারা শর্ত রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।

গত ১২ আগস্ট ছাতক বাজার একতা বালু উত্তোলন ও সরবরাহকারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক মো. দিলোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক আবেদনে চৈলতার ডালা, চেলাগাং, কলাবাগান ও হাদাটিলা এলাকায় রাতের আঁধারে ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়। আবেদনে বলা হয়, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে নদীর পাড় ও নদীতীরবর্তী ফসলি জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে। পাশাপাশি প্রান্তিক বারকি শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আবেদনে অবৈধ ড্রেজার ও বোমা মেশিন জব্দ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

চেলা ও মরা চেলা নদী, বনভূমি, কৃষিজমি ও নদীতীর থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগে জুলাই মাসেই ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে একাধিক সরকারি চিঠি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়েছে। কোনো কোনো চিঠিতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এরপরও যদি ইজারার বাইরে, বনভূমি কিংবা কৃষিজমি থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে সরকারি নথিতে একাধিকবার বিষয়টি ওঠার পরও কার্যকরভাবে তা বন্ধ হচ্ছে না কেন—এ প্রশ্ন উঠছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত হয়েছে কি না, কতটি ড্রেজার বা মেশিন জব্দ করা হয়েছে, মামলা হয়েছে কি না কিংবা অন্য কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব তথ্য জনস্বার্থে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের দাবি, সোনালী চেলা বালুমহালের প্রকৃত ইজারা সীমানা নির্ধারণ করে ইজারা এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে বালুর উৎস, উত্তোলন পদ্ধতি, ড্রেজার ব্যবহারের বৈধতা এবং কথিত ‘রয়্যালটি’ আদায়ের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। বনভূমি, কৃষিজমি ও নদীতীর থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সম্পর্কিত সংবাদ