মৌলভীবাজার

বিধবা-বয়স্ক কোনো ভাতাই জোটেনি, প্রতিবন্ধী নাতনিকে নিয়ে সনকার সংগ্রাম

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
নিজস্ব প্রতিবেদক · শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ · সন্ধ্যা ৬:৫০ · ১৮১ ভিউ

স্বামী নেই প্রায় এক দশক। বয়সও ৭০ ছুঁইছুঁই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটু স্বস্তির আশায় থাকার কথা তাঁর। অথচ সেই স্বস্তি যেন অধরাই থেকে গেছে সনকা তাঁতীর জীবনে। এখনো পাননি বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর নিয়েই তাঁকে সামলাতে হচ্ছে তীব্র সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ১১ বছরের নাতনি সোনালী তাঁতীকে।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কালিটি চা বাগানের বাসিন্দা সনকা তাঁতী। অভাব-অনটন আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই কেটে যাচ্ছে তাঁর জীবন। নিজের দেখভালের সামর্থ্য কমে এলেও প্রতিবন্ধী নাতনির পুরো দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে।

সোনালীকে খাওয়ানো, গোসল করানো, কাপড় বদলানো থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—সবকিছুই করতে হয় সনকাকে। নাতনিকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করতেও তাঁকে শারীরিকভাবে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়।

কিছুদিন আগে একটি বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে সোনালীর জন্য একটি হুইলচেয়ার পেয়েছেন সনকা। এতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও নাতনির সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলেনি তাঁর।

নিজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ ঝরে পড়ে সনকার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘এখনও কোনো ভাতা পাই না। বয়স হয়েছে, চোখে ঝাপসা দেখি। বউমা বাপের বাড়ি গেলে নিরুপায় হয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে যাই। লাকড়ি, ঘাসের জন্য বনে যেতে হয়। কারণ তখন তাকে দেখার মতো আর কেউ থাকে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘নাতনিকে খাওয়ানো, স্নান করানো, কাপড় বদলানো—সব দায়িত্বই এক হাতে সামলাতে হয়। টানাটানি করতে খুব কষ্ট হয়। একা আমি আর কুলিয়ে উঠতে পারি না। হুইলচেয়ার পেয়ে অনেক ভালো হয়েছে।’

সনকার একমাত্র ছেলে রিন্টু তাঁতী। তিনি কীর্তনের কাজে প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকেন। সোনালীর মা মারা যাওয়ার পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর বর্তমান স্ত্রী চা বাগানে কাজ করেন এবং কাজের কারণে বাড়িতে কম থাকেন। ফলে তীব্র সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত সোনালীর দেখভালের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে বৃদ্ধ দাদি সনকার ওপর। রিন্টুর দ্বিতীয় সংসারে রয়েছে দুটি মেয়ে সন্তানও।

স্থানীয় ইউপি সদস্য লছমী নারায়ণ অলমিক জানান, সনকা তাঁতীর জন্য বিধবা ভাতার আবেদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিধবা ভাতার চাহিদা বেশি থাকায় আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এটা একটা বিরাট সমস্যা। যদি না মিলে, তাহলে তাঁকে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ভাতার আওতায় আনার জন্য চেষ্টা করব।’

সনকা তাঁতীর মতো একজন প্রবীণ চা শ্রমিকের জীবনের শেষ সময়ে এসে প্রাপ্য সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। নিজের বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করার পাশাপাশি তাঁকে প্রতিদিন প্রতিবন্ধী নাতনির দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।

বয়সের ভারে যখন তাঁর নিজেরই সহায়তা প্রয়োজন, তখন নাতনির চিকিৎসা, পরিচর্যা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্বও একা সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। একটি হুইলচেয়ার তাঁর কষ্ট কিছুটা কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সনকার জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।

সম্পর্কিত সংবাদ