বিশেষ প্রতিবেদন

আজান হলেই থেমে যায় ঢাকের আওয়াজ, বিয়ানীবাজারে একই উঠানে ৭৫ বছর ধরে মসজিদ-মন্দির

বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি
বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি
প্রতিবেদক · শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ · রাত ৯:০৯ · ১৭৮ ভিউ

তাহের আহমদ, বিয়ানীবাজার

একই উঠান। পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। একদিকে ভেসে আসে আজানের সুর, অন্যদিকে দুর্গাপূজার ঢাকের বাদ্য। তবে আজান হলেই থেমে যায় ঢাকের আওয়াজ। নামাজের প্রথম জামাত শেষ হলে আবার শুরু হয় মন্দিরের পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই প্রায় ৭৫ বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের শানেস্বর বাজার।

সরেজমিনে দেখা যায়, শানেস্বর বাজারের একই উঠানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শানেস্বর বাজার জামে মসজিদ ও শানেস্বর বাজার সার্বজনীন পূজা মণ্ডপ। দুই ধর্মের মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করেও নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন শান্তিপূর্ণভাবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোনাই নদীর তীরবর্তী শানেস্বর বাজারে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মুসলিম ব্যবসায়ীরা নামাজ আদায়ের জন্য মন্দিরের পাশে একটি ছোট ঘর নির্মাণ করেন। সময়ের সঙ্গে সেটিই রূপ নেয় শানেস্বর বাজার জামে মসজিদে। এরপর থেকে একই উঠানে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়।

বর্তমানে সেখানে চলছে শারদীয় দুর্গোৎসব। পূজা শুরুর আগে প্রতিবছর মসজিদ ও মন্দির কমিটির সদস্যরা যৌথভাবে বৈঠকে বসেন। সেখানে পূজার সময়সূচি, নামাজের সময় এবং শব্দ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পারস্পরিক সমন্বয় করা হয়।

আজানের সময় থেকে নামাজের প্রথম জামাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরে ঢাক-ঢোলসহ সব ধরনের শব্দ বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার স্বাভাবিক হয় মন্দিরের কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার কারণে এখন পর্যন্ত মসজিদ-মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে জানান স্থানীয়রা।

মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি ডা. আইয়ুব আলী বলেন, ‘মসজিদের পাশেই মন্দির। দুটিই প্রায় কাছাকাছি সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা মন্দির কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করি, তারাও আমাদের সহযোগিতা করেন। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এ সম্প্রীতির বন্ধন চলে আসছে।’

শানেস্বর বাজার সার্বজনীন পূজা মণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক নবকিশোর চন্দ্র বলেন, ‘মসজিদ-মন্দিরকে ঘিরে এখানে সামান্য বিশৃঙ্খলাও হয় না। জন্মের পর থেকেই এভাবেই দেখে আসছি। সবাই মিলেমিশে যার যার ধর্ম পালন করেন।’

বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহমদ বলেন, একই উঠানে মসজিদ ও মন্দির থাকলেও উভয় ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির সঙ্গে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। এটি বিয়ানীবাজারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।

বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল কবির বলেন, মসজিদ ও মন্দিরকে ঘিরে কোনোদিন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তারপরও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

প্রায় ৭৫ বছর ধরে একই উঠানে পাশাপাশি থাকা মসজিদ ও মন্দির শুধু দুটি উপাসনালয় নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে আছে শানেস্বর বাজারে। ধর্ম যার যার—কিন্তু সম্প্রীতি সবার, এই বার্তাই যেন প্রতিদিন দিয়ে যাচ্ছে সোনাই নদীর তীরের এই ছোট্ট বাজারটি।

সম্পর্কিত সংবাদ