সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে নগরীর রাজনৈতিক আকাশে নতুন এক মেরুকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাজপথে লড়াই করা এবং দলের স্বার্থে বারবার নিজের প্রার্থিতা বিসর্জন দেওয়া এক নেতার নাম এখন মানুষের মুখে মুখে—তিনি অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক এবং সিলেটের রাজনীতিতে ‘ত্যাগের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে পরিচিত এই নেতাকে এবার নগর ভবনের অভিভাবক হিসেবে দেখতে মরিয়া তৃণমূল।
সিলেটের রাজনীতিতে সামসুজ্জামান জামান মানেই এক অকুতোভয় সেনানি। ২০১৩ সালের সিসিক নির্বাচনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী মেয়র প্রার্থী। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত এবং তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের কারণে তিনি হাসিমুখে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। একইভাবে ২০১৮ সালে সিলেট-৪ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেলেও চেয়ারপারসনের নির্দেশে পুনরায় নিজের আসনটি ছেড়ে দিয়ে দলের প্রার্থীর হয়ে দিনরাত কাজ করেন। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও শুধুমাত্র দলীয় শৃঙ্খলা আর গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অটল বিশ্বাসের কারণে তিনি বারবার নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।
সিলেট বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম. ইলিয়াস আলীর সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জামানকেই বিবেচনা করেন। ইলিয়াস আলীর পর সিলেটে বিএনপির শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি শুধু নিজেই নেতা হননি, বরং তার হাত ধরে আজ সিলেটের অনেক কর্মী তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতায় পরিণত হয়েছেন। তিনি হয়ে উঠেছেন নেতৃত্বের এক বড় কারিগর।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান প্রায় ৮০টিরও বেশি মামলার ঘানি টেনেছেন। দফায় দফায় জেল-জুলুম সহ্য করলেও তিনি রাজপথ ছাড়েননি। সর্বশেষ ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনে তিনি সরাসরি সম্মুখ সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। শরীরের সেই বুলেটের ক্ষত এখনো তাকে নগরবাসীর কাছে এক ‘লিভিং লিজেন্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দলের ‘৩১ দফা’ সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং আওয়ামী অপশক্তি রুখে দিতে তার ‘জামান বলয়’ সিলেটে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করছে।
সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির একাধিক নেতা জানান, অ্যাডভোকেট জামান এমন একজন নেতা যিনি পদের চেয়ে দলকে বড় করে দেখেছেন। বারবার ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এবার সময় এসেছে তার এই দীর্ঘ সংগ্রামের মূল্যায়ন করার। সিলেটে বিএনপির দুর্গ রক্ষায় তার বিকল্প নেই।
সিলেট মহানগর ছাত্রদলের একধিক শীর্ষ নেতা বলেন, জামান ভাই আমাদের শুধু নেতা নন, তিনি আমাদের অভিভাবক। চব্বিশের আন্দোলনে তিনি আমাদের বুক আগলে রেখেছিলেন এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আমরা চাই এমন একজন সাহসী ও কর্মীবান্ধব মানুষ সিসিকের মেয়রের চেয়ারে বসুক।
যুবদলের কর্মীরা বলছেন, দলের চরম দুর্দিনে ৮০টির বেশি মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি মাঠে ছিলেন। তার জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী।
নগরীর বন্দরবাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা এমন একজন মেয়র চাই যিনি আমাদের ভাষা বুঝবেন এবং নগরীর প্রকৃত উন্নয়ন করবেন। সামসুজ্জামান জামান একজন শিক্ষিত আইনজীবী এবং সৎ মানুষ। তার প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের পর এখন সিলেটের মানুষের দৃষ্টি স্থানীয় সরকারের এই শীর্ষ পদের দিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামসুজ্জামান জামানকে নিয়ে যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, তা সচরাচর দেখা যায় না। ত্যাগী, লড়াকু এবং কর্মীবান্ধব এই নেতাকে এবার দল থেকে সিসিকের মেয়র পদে চূড়ান্ত করা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সিলেটবাসীর। ত্যাগের বিনিময়ে কি এবার মূল্যায়নের মালা পরবেন সামসুজ্জামান জামান? উত্তরটা এখন সময়ের হাতে এবং বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
