হাওরাঞ্চলের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, মাছ অবতরণ, বরফজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের আধুনিক সুবিধা তৈরির লক্ষ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর গ্রামের পাশে মরা সুরমা নদীর তীরে নির্মাণ করা হচ্ছে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। সর্বশেষ গত ৩০ জুন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপরও নির্মাণকাজ চলছে; এখনো স্থাপন করা হয়নি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি।
প্রকল্পস্থলের সাইনবোর্ডে আবারও সময় বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলমান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পটি কবে নাগাদ পুরোপুরি শেষ হবে এবং কবে থেকে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) বাস্তবায়নাধীন ‘সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প (২য় সংশোধিত)’-এর মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ভবন ও অবকাঠামোর নির্মাণকাজ এগিয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবকাঠামোর কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কেন্দ্রটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় বরফকল, কোল্ড স্টোরেজ ও মেশিনরুমের যন্ত্রপাতি এখনো স্থাপন করা হয়নি। শুধু ভবন নির্মাণ করলেই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি কার্যকর হবে না। মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের জন্য এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন ও চালু করা অপরিহার্য।
২০২৬ সালেও প্রকল্পের আওতায় বরফকল ও আইস ক্রাশার কেনার দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান ছিল। অর্থাৎ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপনের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। ফলে কেন্দ্রটি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পের নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসআই এসএন জেভির সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্ষাকালে পানি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে এবং শিগগিরই তা শেষ হবে।
তবে নতুন করে কতদিনের জন্য সময় চাওয়া হয়েছে এবং সময় বৃদ্ধির আবেদন অনুমোদন হয়েছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে কাজ শুরুর তারিখ ২৫ জুন ২০২৪ এবং শেষ করার নির্ধারিত তারিখ ৩০ জুন ২০২৫ উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের আগস্টেও সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট প্যাকেজের কাজ নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৪ মাস পরও শেষ হয়নি।
এদিকে প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও সরকারি নথিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তালিকায় প্রকল্পটির ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে পরিকল্পনা কমিশনের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) একই প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখ করা হয়েছে ২৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের ওই নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৩১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
ফলে কোন সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় পরিবর্তন হয়েছে এবং বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদিত ব্যয় কত—সরকারি নথিতে থাকা ভিন্ন তথ্যের কারণে তা স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প পরিচালক বিএফডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইসানুল হকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে সময় বৃদ্ধির প্রক্রিয়া, যন্ত্রপাতি স্থাপনের সময়সূচি এবং প্রকল্পের সর্বশেষ আর্থিক অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দিরাইসহ হাওরাঞ্চলের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের জন্য প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি চালু হলে মাছ সংরক্ষণ, বরফজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি জেলেদের উৎপাদিত মাছ দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু দুই দফা মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্মাণকাজ চলমান থাকা এবং কেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি এখনো স্থাপন না হওয়ায় প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
