মুক্তমত

জাগরণে নজরুল, বিপ্লবে নজরুল

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
একুশে সিলেট · রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬ · রাত ১১:৩৬ · ২১০ ভিউ

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে একই সঙ্গে জাগরণ, বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবমুক্তির কবি। ঔপনিবেশিক পরাধীনতা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন, জাতপাত ও সামাজিক শোষণের বাস্তবতায় তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল আত্মমর্যাদা ও মুক্তির অগ্নিবাণী—‘বল বীর—বল উন্নত মম শির!’ নজরুলের বিদ্রোহ তাই নিছক ধ্বংসের আহ্বান নয়; অন্যায় ও শোষণ দূর করে ন্যায়, স্বাধীনতা ও মানবমর্যাদা প্রতিষ্ঠাই তাঁর বিদ্রোহের লক্ষ্য।

নজরুলের বিপ্লবী দর্শনের প্রথম ধাপ জাগরণ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি’ আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার প্রতীক। এই আত্মজাগরণ মানুষকে ভয় ও পরাধীনতার বন্ধন অতিক্রম করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়। ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’-এ সেই জাগরণ রূপ নেয় প্রত্যক্ষ প্রতিরোধের আহ্বানে—শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ডাক। তরুণ সমাজকে তিনি পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে দেখেছেন।

‘কান্ডারী হুশিয়ার!’-এ নজরুলের বিপ্লবী চিন্তা আরও বিস্তৃত হয়ে নেতৃত্ব, ঐক্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দর্শনে পরিণত হয়। সংকটের সময়ে তিনি শুধু নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বলেননি; বঞ্চিত মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কাছে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ছিল করুণা নয়, অধিকার।

সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। ‘কান্ডারী হুশিয়ার!’ ও ‘সাম্যবাদী’তে তিনি হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষের ঐক্যের কথা বলেছেন। তাঁর দর্শনে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয়। ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি ঘোষণা করেছেন—‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!’ ধর্মের নামে মানুষের প্রতি বৈষম্য, জাতপাত ও সামাজিক অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধেও তাঁর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার।

‘প্রলয়শিখা’য় নজরুলের বিপ্লবী চেতনা পুরোনো অন্যায় কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়। তাঁর ‘প্রলয়’ ধ্বংসের জন্য ধ্বংস নয়; অন্যায় ধ্বংস করে ন্যায়ভিত্তিক নতুন সমাজের পথ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে তাঁর কাব্যভাষায় হিন্দু-মুসলিম উভয় ঐতিহ্যের প্রতীক ও শব্দের সৃষ্টিশীল ব্যবহার সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদের শক্তিশালী প্রকাশ।

নজরুলের মুক্তির ধারণা কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুধা, শোষণ, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত ও অধিকারহীনতা দূর না হলে মানুষের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি সম্ভব নয়—তাঁর কবিতার অন্তর্নিহিত দর্শন এ কথাই নির্দেশ করে। তাই তাঁর বিপ্লবকে রাজনৈতিক মুক্তি, সামাজিক সাম্য ও মানবিক মুক্তি—এই তিনটি পরস্পরসম্পর্কিত স্তরে দেখা যায়।

নির্বাচিত ছয়টি কবিতা—‘বিদ্রোহী’, ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’, ‘কান্ডারী হুশিয়ার!’, ‘প্রলয়শিখা’, ‘সাম্যবাদী’ ও ‘মানুষ’—পাশাপাশি পাঠ করলে নজরুলের বিপ্লবী দর্শনের একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়: জাগরণ → প্রতিবাদ → প্রতিরোধ → রূপান্তর → সাম্য → মানবমুক্তি।

সমকালীন সমাজেও নজরুলের এই দর্শনের গভীর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন, শোষণ এবং দুর্বল মানুষের অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা আজও প্রশ্ন তোলে। তাঁর ‘উন্নত শির’ আত্মমর্যাদার, ‘কান্ডারী’ দায়িত্বশীল নেতৃত্বের এবং ‘সাম্যের গান’ মানবিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে আছে।

নজরুলের বিদ্রোহের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল শান্তি—এমন এক সমাজ, যেখানে অত্যাচার থাকবে না, উৎপীড়িতের কান্না থাকবে না এবং মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হবে না। তাই নজরুলের বিপ্লব ধ্বংসের দর্শন নয়, রূপান্তরের দর্শন; তাঁর বিদ্রোহ মানুষের বিরুদ্ধে নয়, মানুষের মুক্তির জন্য। তিনি প্রথমে মানুষকে জাগান, এরপর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখান, বিভেদ অতিক্রমের শিক্ষা দেন এবং সর্বশেষে মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানান।

এই অর্থে কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কবি নন—তিনি জাগরণের কবি, সাম্যের কবি, বিপ্লবের কবি এবং সর্বোপরি মানবমুক্তির কবি।

আবু মুসা মোঃ তারেক
বিদ্যালয় পরিদর্শক
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট

সম্পর্কিত সংবাদ