সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
পাঠদান শুরুর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত পূর্ণাঙ্গ রূপ ও নিজস্ব হাসপাতাল পায়নি সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। স্থায়ী হাসপাতাল ও পর্যাপ্ত জনবলের দাবিতে দীর্ঘ ৮ দিন ধরে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে অবস্থান করছেন শিক্ষার্থীরা। গত ২১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের আলফাত স্কয়ার মোড়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থীর এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে যোগ দিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লিনিক্যাল ক্লাসের অভাব এবং স্থায়ী হাসপাতাল চালুর বিষয়ে প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতায় তাদের ‘ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন’ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদিত এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১০৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই কাজ কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, যে কাজ ১৮ মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা ৭২ মাসেও আলোর মুখ দেখেনি।
কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম সাকিব বলেন, “সেপ্টেম্বরে আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা, অথচ শিক্ষক সংকটের কারণে সিলেবাসের অনেক কিছুই পড়ানো হয়নি। অন্যান্য মেডিকেল কলেজে যেখানে দিনে ৩টি ক্লাস হয়, আমাদের হয় মাত্র একটি। হাসপাতাল না থাকায় আমাদের ক্লিনিক্যাল জ্ঞান অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।”
আরেক শিক্ষার্থী পৃথ্বীরাজ চৌধুরী জানান, বাসে করে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে গিয়ে ক্লিনিক্যাল ক্লাস করতে হয়। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসক সংকটের কারণে পর্যাপ্ত শেখার সুযোগ নেই।
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোল্লা রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, অডিটোরিয়াম ও অক্সিজেন প্ল্যান্ট ছাড়া প্রায় সব ভবনের কাজই শেষ। ভবনগুলো হস্তান্তরের পর্যায়ে রয়েছে।
তবে মূল সংকট দেখা দিয়েছে জনবল নিয়োগ নিয়ে। প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, হাসপাতালের জন্য ১৯৩৫ জন জনবলের চাহিদা পাঠানো হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় মাত্র ৭৪ জনের অনুমোদন দিয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে বিশাল এই অবকাঠামো বুঝে নেওয়া বা হাসপাতাল চালু করা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প কেন ঝুলে আছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
সংকট নিরসনে ১ জুলাই (বুধবার) স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাক আহমেদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তিনি নিয়মিত মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। হাসপাতাল চালুর বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ‘রোডম্যাপ’ দাবি করেছেন তিনি।
তবে শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়েছেন, হাসপাতাল চালু ও জনবল নিয়োগের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না। কলেজের একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
বিশাল বাজেটের এই প্রকল্পের সুফল কবে নাগাদ সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা পাবে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
