সুনামগঞ্জ

হাওরে মাছের সংকট, জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় জামালগঞ্জের জেলেরা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
নিজস্ব প্রতিবেদক · বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ · রাত ৮:০৯ · ১৬৫ ভিউ

এক দশক আগেও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হালি ও পাকনার হাওর ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম সমৃদ্ধ ভান্ডার। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব হাওর থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ ঢাকা, ভৈরব, কুলিয়ারচরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। নিষেধাজ্ঞার সময় পোনা ও মা মাছ ধরা, অবৈধ জালের ব্যবহারসহ নানা কারণে কমেছে মাছের উৎপাদন।

ফলে বর্ষার ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে আশানুরূপ মাছ ধরা পড়ছে না। স্থানীয় বাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে মাছের সংকট। হাওরের মাছের ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলে পরিবারও পড়েছে চরম বিপাকে।

উপজেলার বৃহত্তম পাকনা ও হালি হাওর বর্ষাকালে প্রায় ছয় মাস অথৈ পানিতে পূর্ণ থাকে। এসব হাওরে কালিবাউশ, পাবদা, চিংড়ি, লাছু, বোয়াল, বাঁশপাতা ও চাপিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যায়। স্বাদ ও চাহিদার কারণে এসব মাছের দামও এখন অনেক বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এক মণ ধান বিক্রি করেও এখন এক কেজি দেশীয় মাছ কেনা কঠিন।

দেশীয় প্রজাতির মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে জেলেরা জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার, জলাশয় ভরাট, নির্বিচারে মা ও পোনা মাছ শিকার এবং বিলের তলা শুকিয়ে মাছ ধরাকে দায়ী করছেন। এসব কারণে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

জেলেদের দাবি, অনেক প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। আমানিপুর, শ্রীমন্তপুর, জামলাবাজ, বদরপুর, উত্তর কামলাবাজ, গোপালপুর, নিতাইপুর ও শরৎপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ হাওরে জাল নিয়ে গেলেও আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। এতে জেলে পরিবারগুলোর আয় কমে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন অনেকে।

আমানিপুর গ্রামের জেলে রাধাকান্ত বর্মণ বলেন, “কয়েক দশক আগেও খাল-বিলে হাতে কিংবা জালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে পোনা ও মা মাছ ধরা, জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং কারেন্ট ও চায়না দোয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে মাছের বংশ প্রায় শেষ হয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “হাওরে দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে এবং জেলেদের আয়ের পথ তৈরি করতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকার যদি জাল কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে জেলেরা নিজেরাই জাল কিনে মাছ ধরতে পারতেন।”

সাচনা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী শমসের আলী বলেন, “এক দশক আগেও হাওর থেকে সকাল-বিকেল জেলেরা মাছ ধরে সাচনা বাজারে নিয়ে আসতেন। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার মাছ ঢাকা, ভৈরব ও কুলিয়ারচরে পাঠানো হতো। এখন যে পরিমাণ মাছ আসে, তা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করাই কঠিন।”

তিনি আরও বলেন, “হাওরে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের জন্য অভয়াশ্রম স্থাপন করে পোনা মাছ অবমুক্ত ও সংরক্ষণ করা গেলে মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। হাওরের জেলেদের রক্ষা করতে হলে সরকার ও হাওরবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”

জামালগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস ইবনে রহিম বলেন, হাওরে মাছ ধরার জন্য জেলেদের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। পরিচয়পত্র পাওয়া জেলেরা সমবায় সমিতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পোনা ও মা মাছ ধরা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং বিলের তলা শুকিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে।

মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, বিলের মালিক, এলাকাবাসী ও প্রশাসন সম্মিলিতভাবে কাজ করলে দেশীয় মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাবে। এতে হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকাও সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত সংবাদ