জাতীয়

হামের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, বিশ্বকে সতর্ক করল ডব্লিউএইচও

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
একুশে সিলেট · শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ · রাত ৮:৪৯ · ১৮৬ ভিউ

হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি এবং দুর্গম এলাকায় শিশুদের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছাতে না পারার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা টিকাদানের হার কমে যাওয়া নিয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যও বড় সতর্কবার্তা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২২ হাজারের পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে। চলতি বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেশি। এ সময়ে অত্যন্ত সংক্রামক এ রোগে ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম।

ডব্লিউএইচওর টিকা-বিষয়ক উপদেষ্টা এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক মার্ক জিট বলেন, ‘এটি প্রতিটি দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।’ তার মতে, টিকাদানের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার চেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। জরুরি পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এলেও এর মধ্যে বহু মানুষ আক্রান্ত হবেন এবং কারও কারও মৃত্যু হবে।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা ডব্লিউএইচওর নথি এবং এক ডজনের বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে হামের জরুরি মোকাবিলায় শিশুদের অসম্পূর্ণ তথ্য, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং অভিভাবকদের কাছে পৌঁছাতে না পারার মতো সমস্যাও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো আরও প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার।

টিকা না পেয়ে শিশুমৃত্যু, ক্ষোভ স্বজনদের

বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি সিলেট। সেখানে গত জুলাইয়ে দুই বছর বয়সি আরমান হোসেন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। টিকা না পাওয়া শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারটি তাদের তিন চাকার অটোরিকশা বিক্রি করেছিল। তবে আরমানের চার বছর বয়সি টিকাবিহীন বোন বেঁচে যায়।

আরমানের বাবা ২৬ বছর বয়সি আমিন মিয়া বলেন, তাদের প্রত্যন্ত গ্রামে সময়মতো টিকা দেওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। তার ভাষায়, ‘ছেলেকে দাফন করার পরই তারা এসেছিলেন।’

একই অঞ্চলের ছাতক শহরে গত জুনে হামে মারা যায় নয় মাস বয়সি লাবিবা আক্তার। তার বাবা ৩০ বছর বয়সি কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদের অভিযোগ, টিকা দেওয়ার বিষয়ে তাদের জানাতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। অথচ জরুরি কর্মসূচির আওতায় এপ্রিলে টিকা দেওয়ার বয়সসীমা নয় মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করায় লাবিবার টিকা পাওয়ার সুযোগ ছিল।

ডব্লিউএইচওর হিসাবে, সাধারণত প্রতি এক হাজার হাম আক্রান্তের মধ্যে দুই থেকে তিনজনের মৃত্যু হয়। তবে অপুষ্টিসহ নানা কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে এ রোগের প্রাণঘাতী হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

গত মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির ফলে সংক্রমণের হটস্পটগুলোতে রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ।

টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে

একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্যের উদাহরণ ছিল বাংলাদেশ। ডব্লিউএইচও ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৪ সালে দেশে হামের প্রথম ডোজের আওতায় এসেছিল ৯৬ শতাংশ শিশু এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছিল ৯৩ শতাংশ। এক ডোজের পর অল্পসংখ্যক শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।

কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, টিকা কেনার আদেশে বিলম্ব এবং নিয়মিত টিকাদানের পরবর্তী কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে হাম টিকার প্রথম ডোজের আওতা কমে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের আওতা ৮৬ শতাংশে নেমেছে। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ডব্লিউএইচও অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দেয়।

প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হামসহ বিভিন্ন রোগের টিকাদানের সরকারি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। প্রাথমিক হিসাবে কখনো কখনো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যা শিশু গণনা বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুলের ইঙ্গিত দেয়।

জরুরি কর্মসূচিতে বাদ পড়েছে লাখো শিশু

হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে বাংলাদেশ দ্রুত জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করে। এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর নতুন রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। সরকার জানিয়েছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু জুনে একই বয়সি শিশুদের জন্য আরেকটি স্বাস্থ্য কর্মসূচির তালিকায় আগের হামের কর্মসূচির তুলনায় ৪০ লাখ বেশি শিশুর নাম পাওয়া যায়। এতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ার বিষয়টি সামনে আসে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার রয়টার্সকে বলেছিলেন, অভিভাবকদের অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতার কারণে অনেকেই টিকা নিতে পারেনি।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা এপ্রিল ও আগস্টের সরকারি বৈঠকের কার্যবিবরণীতে প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। সাধারণত জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে চার দফা প্রস্তুতি যাচাই করা হলেও সময়ের সীমাবদ্ধতায় এবার মাত্র এক দফা যাচাই করা হয়েছিল। এতে টিকা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় শীতলীকরণব্যবস্থা এবং কত শিশু টিকা পাবে—এমন বিষয়গুলো পরীক্ষা করা হয়।

বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রস্তুতি যাচাই যথাযথ না হলে সবচেয়ে দরিদ্র এবং দুর্গম এলাকার শিশুরাই টিকা থেকে বঞ্চিত হয় এবং এর মূল্য তাদেরই দিতে হয়।

আগস্টের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, জরুরি কর্মসূচির আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে টিকা না নেওয়া শিশুর হার ছিল ৮২ শতাংশ; কর্মসূচির পরও তা বেড়ে ৮৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, টিকাদানের ঘাটতি দূর হয়নি।

বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর উপপ্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল বলেছেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে সরকারকে সহযোগিতা দিতে সংস্থাটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘাটতি এড়াতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষম করতে হবে।

সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা বড় চ্যালেঞ্জ

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আগে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে নতুন টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে যুক্ত করা হবে।

তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনো কঠিন। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। এ ছাড়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সি শিশুরা মোট হাম আক্রান্তের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

এদিকে, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের শরীরে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। সাধারণত এ বয়সে মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুদের সুরক্ষা দেয়।

হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে থাকা বাংলাদেশের জন্য আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। সেপ্টেম্বরে রয়টার্স সিলেটের ১০০ শয্যার শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে গিয়ে প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীর চাপ দেখতে পায়। সেদিন হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিল ১৭৮ জন রোগী।

সূত্র : রয়টার্স

সম্পর্কিত সংবাদ