নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরু হয়ে জুনের মধ্যে তা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর এর পরপরই অনুষ্ঠিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। ভোটের আনুষ্ঠানিক তফসিল ও দিনক্ষণ নির্ধারণে কিছুটা সময় বাকি থাকলেও সীমান্তঘেঁষা পাহাড় আর চা-বাগানের জনপদ সিলেটের জৈন্তাপুরে এখনই বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামীণ হাটবাজার—সবখানেই আগাম ভোটের চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সাধারণত স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী—এই তিন শক্তির লড়াই দেখা গেলেও এবার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবার নির্বাচনে তাদের প্রার্থী দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ভোটের মাঠের লড়াইটি হয়তো প্রথাগতভাবেই বিএনপি ও জামায়াতের দ্বিমুখী লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে।
তবে সেই চেনা হিসাব-নিকাশে বড় চমক হয়ে এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জন্ম নেওয়া তরুণদের হাতে গড়া নতুন রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। আর দলটির মনোনীত উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. জাকারিয়া লাদেন রীতিমতো ওলটপালট করে দিয়েছেন দীর্ঘদিনের নির্বাচনী সমীকরণ। সবুজ ঘাসের মাঠে যাঁর ক্ষিপ্রতা আর বিশ্বস্ত গ্লাভস প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোল আটকে দিত, সেই সাবেক ফুটবল তারকা এবার রাজনীতির মাঠে এসে দাঁড়িয়েছেন এক শক্ত প্রাচীর হয়ে। তাঁর এই অভাবনীয় উত্থান ভোটের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের মতো দুই প্রতিষ্ঠিত দলের প্রার্থীদের জন্য বড় ধরনের এক ‘মাথাব্যথার কারণ’ হয়ে উঠেছে।
জৈন্তাপুরের মানুষের কাছে তিনি শুধুই ‘লাদেন’ নামে পরিচিত ও আপন। অতীতে উপজেলার মাঠ কাঁপানো সেরা গোলকিপার এবং বর্তমানে মাঠের ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে ওঠা দক্ষ ফুটবল রেফারি। খেলার মাঠ থেকে এবার তিনি সরাসরি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মূল লড়াইয়ে। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, ক্রীড়াঙ্গনের জনপ্রিয়তা আর তরুণ প্রজন্মের অকুণ্ঠ সমর্থনকে পুঁজি করে এনসিপির এই আহ্বায়ক মাঠে নেমে আসায় জৈন্তাপুরের রাজনৈতিক মেরুকরণে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া।
নবগঠিত দল হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে শুরুতে অনেকের সংশয় ছিল। কিন্তু নিজের সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও তৃণমূলমুখী তৎপরতার মাধ্যমে সেই সংশয় দূর করেছেন মো. জাকারিয়া লাদেন। জৈন্তাপুরে দলকে সুসংগঠিত করে তিনি ইতোমধ্যে এনসিপিকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় নিয়ে গেছেন এবং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন। দলের প্রতি মানুষের এই আগ্রহ তৈরি হয়েছে মূলত লাদেনের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনীর কারণে।
সামনে ইউপি নির্বাচন শেষেই উপজেলা নির্বাচন—এমন রোডম্যাপ থাকায় দলগুলো যখন রণকৌশল সাজাতে ব্যস্ত, তখন এনসিপি সবার আগে জাকারিয়া লাদেনকে চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা করে চমক দেখায়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা ছিল বিএনপি বা জামায়াতের। কিন্তু দল দুটি এখনো পর্যন্ত প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের দোলাচলে যখন তারা নিমজ্জিত, ঠিক সেই সুযোগটি পুরোপুরি লুফে নিয়েছেন সাবেক এই ক্রীড়াবিদ।
দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে সবার আগে মাঠে নামার এক বিশাল ‘ফার্স্ট মুভার অ্যাডভান্টেজ’ বা আগাম সুবিধা পাচ্ছেন লাদেন।
জৈন্তাপুরের তরুণ সমাজের কাছে জাকারিয়া লাদেনের গ্রহণযোগ্যতা এক দিনে তৈরি হয়নি। ক্রীড়াঙ্গনে একজন সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে তাঁর সুনাম দীর্ঘদিনের। মাঠের রাজনীতিতে যেখানে সংঘাত আর কাদা-ছোড়াছুড়ি নিত্যদিনের বিষয়, সেখানে লাদেনের মূল শক্তি তাঁর ‘বিতর্কহীন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’। একজন খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার মানুষ হিসেবে সব মত ও বয়সের মানুষের মাঝেই তাঁর রয়েছে অবাধ যাতায়াত। স্থানীয় ভোটারদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানুষ প্রথাগত রাজনীতির বাইরে একজন সৎ ও মাটির কাছাকাছি থাকা নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছিল; জাকারিয়া লাদেন সেই প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
শুধু মাঠের ভাবমূর্তি নয়, রাজপথেও নিজের শক্তির স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন জাকারিয়া লাদেন। সম্প্রতি জৈন্তাপুরের হরিপুর বাজারে এনসিপির উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ ছিল তাঁর সাংগঠনিক শক্তির এক বড় মহড়া। কয়েক হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সেই কর্মসূচি গোটা সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক মহলেই তোলপাড় সৃষ্টি করে। এই বিশাল জমায়েত প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ে তিনি কতটা সফল। একই সঙ্গে এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও লাদেনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।
সব মিলিয়ে জৈন্তাপুরে এবার ভোটের সমীকরণ পুরোপুরি এক নতুন মেরুকরণে রূপ নিয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, অন্যদিকে প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নীরবতা—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই তরুণ প্রজন্মের নতুন কণ্ঠস্বর ও আইকন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এনসিপির এই নেতা।
ফুটবল মাঠে গোলপোস্ট আগলে রেখে দলকে বাঁচানোই ছিল যাঁর চিরাচরিত দায়িত্ব, ভোটের রাজনীতিতে তিনি এবার রক্ষণ ও আক্রমণ—দুই ফ্রন্টেই সমান তালে লড়ছেন। ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর শক্ত আক্রমণ রুখে দিয়ে ব্যালটের লড়াইয়ে সাবেক এই গোলকিপার শেষ পর্যন্ত জৈন্তাপুরের মসনদে বিজয়ের হাসি হাসতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় স্থানীয় জনপদ।
