সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় শিক্ষা পদক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত সাড়ে ১১ লাখ টাকার সরকারি তহবিল নিয়ে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ স্কুলেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে খেলাধুলার আয়োজন করা হয়নি এবং প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের জন্য কোনো শিক্ষাউপকরণও কেনা হয়নি। বরাদ্দের সমুদয় অর্থ প্রধান শিক্ষকরা নিজেদের পকেটে পুরেছেন বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ‘জাতীয় শিক্ষা পদক ২০২৬’ উপলক্ষে উপজেলার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে খেলাধুলার জন্য ৪ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির কোমলমতি শিশুদের খেলনা ও নানা সরঞ্জাম কেনার জন্য প্রতিটি স্কুলে ৭ হাজার টাকা করে মোট ৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভিন্ন চিত্র। সুখলাইন, নারকিলা, রসিকলাল, প্রতাপপুর, লক্ষীপাশা, বাহাড়া ও রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ স্কুলেই কোনো খেলাধুলা করানো হয়নি। প্রাক-প্রাথমিকের জন্য কেনা হয়নি কোনো সরঞ্জাম। এমনকি উপজেলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঘুঙ্গিয়ারগাঁও সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রাক-প্রাথমিকের কোনো উপকরণ কেনা হয়নি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের মতে, এই বরাদ্দের টাকা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির অ্যাকাউন্টে না দিয়ে সরাসরি প্রধান শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পাঠানোতেই এই অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রধান শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অধিকাংশ শিক্ষকই শিশুদের খেলাধুলা করাননি এবং উপকরণও কেনেননি। বরাদ্দ পেয়েও তা ব্যবহার না করা শিক্ষক সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।”
জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম জানায়, “আমদের কোনো খেলাধুলা করানো হয় নাই। স্যাররা ঠিকমতো স্কুলেও আসেন না, দুপুর ১২টার পরেই ছুটি দিয়ে দেন।”
অনিয়মের বিষয়ে ঘুঙ্গিয়ারগাঁও মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরঞ্জিত চৌধুরীসহ কয়েকজন শিক্ষক কোনো সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। অন্যদিকে, কয়েকজন শিক্ষক টাকা পাওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে শাল্লা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও লক্ষীপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোজ কান্তি সরকার বলেন, “বাচ্চাদের খেলাধুলা না করানো অন্যায় ও সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা। টাকা পেতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় প্রাক-প্রাথমিকের সরঞ্জাম কেনায় দেরি হতে পারে, তবে তা দ্রুতই কিনে ফেলা হবে।”
শাল্লা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পরিমল কুমার ঘোষ অনিয়মের সত্যতা কিছুটা স্বীকার করে বলেন, “শুরুতে শিক্ষকরা কিছু ঢিলেমি করলেও সবাইকে উপকরণ কেনার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো ঢিলেমির সুযোগ দেওয়া হবে না। শতভাগ স্কুলেই সরঞ্জাম কেনা নিশ্চিত করা হবে।” খেলাধুলার বিষয়ে শিক্ষকরা আয়োজন করার কথা জানালেও তিনি আবার খোঁজ নেবেন বলে জানান।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস জানান, শাল্লা উপজেলার সরকারি বরাদ্দের অনিয়মের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
