দল থেকে বহিষ্কার হলেই কোনো সংসদ সদস্যের (এমপি) পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলত্যাগ ও সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট বিধান থাকলেও দলীয় বহিষ্কারের পর এমপি পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে অতীতে একাধিক সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও পুরো মেয়াদ এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যাদের মধ্যে ছিলেন, সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, ডা. মুরাদ হাসান।
এছাড়াও ২০১৯ সালে গণফোরাম থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান। বহিষ্কার হয়েও তারা পুরো মেয়াদে এমপি হিসেবে বহাল ছিলেন।সর্বশেষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
বুধবার (২২ জুলাই) জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরই প্রশ্ন ওঠে, দলীয় বহিষ্কারের ফলে তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে, নাকি আসন শূন্য হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানে ‘দল থেকে পদত্যাগ’ এবং ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া’—এই দুই ক্ষেত্রে সদস্যপদ বাতিলের বিধান রয়েছে। কিন্তু দল কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলে তার আসন শূন্য হবে কি না, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। এ কারণে অতীতেও বহিষ্কৃত কয়েকজন এমপি তাদের মেয়াদ পূর্ণ করেছেন।
এ ধরনের নজিরের মধ্যে অন্যতম গোলাম মাওলা রনি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে বহিষ্কারের পরও তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকে এবং ২০১৪ সালে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আরেকটি আলোচিত ঘটনা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে ঘিরে। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে দেওয়া এক বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে তাকে মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি চললেও ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি নিজেই সংসদে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ফলে তার আসন শূন্য হয় দলীয় বহিষ্কারের কারণে নয়, বরং স্বেচ্ছায় পদত্যাগের মাধ্যমে।
২০২১ সালে ফোনালাপ বিতর্কের পর তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয় ডা. মুরাদ হাসানকে। পরে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগও তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ না করায় তার এমপি পদ বহাল থাকে এবং একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
এসব ঘটনার পর্যালোচনায় দেখা যায়, দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ হারানো এক বিষয় নয়। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজে দলত্যাগ না করলে বা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট না দিলে কেবল দলীয় বহিষ্কারের কারণে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা আইনগতভাবে সহজ নয়।
ফলে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও তার সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংবিধানের ব্যাখ্যা, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
