রাজনীতি

এক মাসেও এল না ছাত্রদলের নতুন কমিটি, নেপথ্যে কী?

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
একুশে সিলেট · রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · রাত ১১:১০ · ১৪৬ ভিউ

দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা বিদায়ের বার্তাও দিয়েছিলেন। সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের নামও পৌঁছেছিল বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। তাঁর সঙ্গে বর্তমান দুই শীর্ষ নেতার সাক্ষাতের পরপরই নতুন কমিটি ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু এরপর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।

শেষ মুহূর্তে কী কারণে আটকে গেল ছাত্রদলের নতুন কমিটি—এ নিয়ে বিএনপি, ছাত্রদলসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে।

অপেক্ষাকৃত তরুণদের সামনে আনা হবে, নাকি দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা অভিজ্ঞ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে—মূলত এ বিষয়টি নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেমে নেই। তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয়ে নেতৃত্ব গঠনের চেষ্টা চলছে।

এ ক্ষেত্রে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সংগঠনের ফলাফল, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরপরই নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। শুরুতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি দেওয়ার চিন্তা ছিল।

কিন্তু এরপর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ শিক্ষার্থীদের মানসিকতা, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে ছাত্রদলের নেতৃত্ব গঠনের পরামর্শ দেন।

সূত্রটির ভাষ্য, এরপর সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনা এবং দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা অভিজ্ঞ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভিন্ন মত আসে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি কে হবেন, তা তারেক রহমান মোটামুটি ঠিক করে রেখেছেন। এখন সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য শীর্ষ পদগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। অভিজ্ঞতা, আন্দোলনে ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ—এই তিন বিষয় সমন্বয় করে নেতৃত্ব সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে অন্য সূত্রগুলোর ভাষ্য, শীর্ষ দুই পদে সিনিয়র ও জুনিয়র নেতৃত্বের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। কোন পদে কাকে রাখা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলেছে, দলের শীর্ষ পর্যায়ে ছাত্রদলকে আরও তারুণ্যনির্ভর করার পক্ষে মত রয়েছে। সংগঠনটির নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত পুরোনো শিক্ষাবর্ষের নেতাদের প্রাধান্য নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনাও রয়েছে।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নেতৃত্বের বয়স ও শিক্ষাজীবনের ব্যবধান কমানো এবং নতুন প্রজন্মের ভাষা ও প্রত্যাশা বোঝার জন্য অপেক্ষাকৃত জুনিয়র নেতাদের সামনে আনার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

তবে তারেক রহমান যাঁদের পরামর্শ নিয়েছেন, তাঁদের সবাই এ মতের সঙ্গে একমত নন। সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্রের মতে, গত ১৫ বছরের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মাঠে থাকা ছাত্রদলের অনেক নেতা মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন। ছাত্রলীগকে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার অভিজ্ঞতাও তাঁদের রয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কৌশল সম্পর্কেও তাঁরা অভিজ্ঞ।

এসব অভিজ্ঞ নেতাকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব তুলনামূলক জুনিয়রদের হাতে দেওয়া ঠিক হবে না—এমন মতও তারেক রহমানের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। শীর্ষ দুই পদে একজন তুলনামূলক সিনিয়র এবং অন্যজন জুনিয়র নেতাকে রাখার চিন্তাভাবনা রয়েছে। সিনিয়র নেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

তবে ‘সিনিয়র’ ও ‘জুনিয়র’ বলতে ঠিক কোন শিক্ষাবর্ষ বোঝানো হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। শীর্ষ পদে আগ্রহীদের মধ্যে ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের অনেক নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে।

ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনকে শুধু কমিটি পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না বিএনপির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সংগঠনের ফলাফলও নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের আলোচনায় এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা ভালো ফল করেছেন। সেই তুলনায় ছাত্রদলের ফলাফল ছিল দুর্বল। ফলে আগামী ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে সংগঠন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, সেটিও নেতৃত্ব নির্বাচনে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একটি সূত্র বলেছে, এমন নেতৃত্ব আনার পক্ষে মত এসেছে, যাঁরা শুধু দলীয় কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখবেন না; সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছেও সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারবেন।

নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নের সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজনের মূল্যায়ন, ছাত্রশিবিরে কেন্দ্র থেকে নিচের স্তর পর্যন্ত তুলনামূলক সুসংগঠিত নির্দেশনা ও তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। বিপরীতে ছাত্রদল এবং অতীতে ছাত্রলীগে বিভিন্ন নেতা ও পক্ষকেন্দ্রিক গ্রুপ-উপগ্রুপের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।

তাঁর ভাষ্য, ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি পরিচালনা করলেই হবে না; বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও কলেজ পর্যায়ের সংগঠনকেও একই সাংগঠনিক ধারায় পরিচালনার সক্ষমতা থাকতে হবে।

অন্য সংগঠন থেকে এসে ছাত্রদলে জায়গা নেওয়া ঠেকানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। একটি সূত্র বলেছে, অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার ক্ষেত্রে তাঁর অতীত রাজনৈতিক পরিচয় ভালোভাবে যাচাইয়ের পক্ষে মত রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিকূল সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা নেতাদের সাংগঠনিক ভূমিকা ও নিবেদনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত সংবাদ