সিলেট

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় এক আসামির মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক · মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ · ৭:৪৬ পিএম · ২০৫ ভিউ

সিলেটের ঐতিহাসিক এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক তরুণীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বহুল আলোচিত মামলায় আট আসামির মধ্যে একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অপর্যাপ্ত প্রমাণের কারণে বাকি চার আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার দীর্ঘ শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে রায় পাঠ শুরু করে বেলা ১টা ৫৩ মিনিটে তিনি রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড এবং শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম রনি ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অপরদিকে আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ইসলাম এবং মাহফুজুর রহমানকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আসামিপক্ষের প্রতিক্রিয়া

রায়ের পর অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষ্য নেই। ভুক্তভোগীও আদালতে তাদের শনাক্ত করেননি। অপরাধ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

এর আগে সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তারা দাবি করেন, রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে তাদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং তারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নন।

যে ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল দেশকে

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এক তরুণী স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে শাহপরান (রহ.) মাজার এলাকা থেকে ফেরার পথে টিলাগড়ে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে তাদের গাড়ির গতিরোধ করা হয়। পরে কয়েকজন যুবক তাদের জিম্মি করে প্রাইভেটকারসহ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়।

সেখানে স্বামীকে বেঁধে মারধর করে একটি কক্ষে আটকে রেখে তরুণীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পরে টাকা-পয়সা ও গাড়ি রেখে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ছাত্রাবাসে অভিযান চালায়। তবে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। অভিযানের সময় ছাত্রাবাসের বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে যা উঠে আসে

ঘটনার তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র‍্যাব অভিযুক্ত ছয়জন এবং সন্দেহভাজন আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে কয়েকজন আসামি ঘটনার দায় স্বীকার করেন। তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের নমুনার মিল পাওয়া যায় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

বিচার প্রক্রিয়া

মামলাটির বিচার প্রথমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে শুরু হলেও বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরবর্তীতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। বিচার চলাকালে মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ভুক্তভোগী, তার স্বামী, তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট এবং এমসি কলেজের শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বহুল আলোচিত এ মামলার রায়ের দিন আদালত প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

সম্পর্কিত সংবাদ