পাহাড়ি ঝরনা, স্বচ্ছ জল আর পাথরের মিতালিতে ঘেরা সিলেটের বিছনাকান্দি যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। কিন্তু সেই ক্যানভাসে এখন বিষাদ আর ধ্বংসের ছাপ। বালু উত্তোলনের ইজারা নিয়ে তার আড়ালে পরিবেশবিধ্বংসী ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে অবৈধভাবে পাথর তুলছে একটি প্রভাবশালী চক্র। ফলে পর্যটনের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে।
বিছনাকান্দির ১৩ নম্বর ইউনিয়নজুড়ে এখন সাধারণ মানুষের হাহাকার। স্থানীয়দের অভিযোগ, মেসার্স মান্নান ট্রেডার্স হাদারপাড় বালু মহালের ইজারা নিলেও তারা নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে পর্যটন স্পটের একেবারে কোল ঘেঁষে পাথর উত্তোলন করছে। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব। জয়নাল, আবজল, মাসুম, সুলতান ও বুরহান নামের এক চক্রের নেতৃত্বে দানবাকৃতির বোমা মেশিনগুলো যখন চলতে শুরু করে, তখন শব্দ আর কম্পনে প্রকম্পিত হয় পুরো এলাকা। বসতবাড়ি আর কৃষিজমিতে দেখা দিচ্ছে ফাটল।
এ বিষয়ে নিয়মিত পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াত করা পর্যটনপ্রেমী ফাহিম আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিছনাকান্দি আমাদের প্রাকৃতিক অহংকার। কিন্তু পাথর উত্তোলনের নামে যেভাবে গর্ত খুঁড়ে চারপাশ বিধ্বস্ত করা হচ্ছে, তাতে এই পর্যটন স্পটটি আর কয়েক বছর পর খুঁজে পাওয়া যাবে না। পর্যটকরা এখানে আসে নির্মল প্রকৃতির খোঁজে, যন্ত্রের বিকট শব্দ আর ধ্বংসস্তূপ দেখতে নয়। এভাবে চলতে থাকলে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেবে।’
বালু মহালের ইজারাদার আবদুল মান্নান বিষয়টিকে ‘বালুর সঙ্গে আসা সামান্য পাথর’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন ভিন্নভাবে। পরিবেশবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞ আব্দুল হাই বলেন, ‘বোমা মেশিন ব্যবহার মানেই পরিবেশের মৃত্যুদণ্ড। এই যন্ত্র মাটির গভীর থেকে পাথর শুষে নেওয়ার সময় মাটির ভূ-প্রাকৃতিক গঠন ও জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং আশপাশের কৃষিজমি ধসে পড়ছে। এটি কেবল অবৈধ নয়, বরং একটি ভয়াবহ পরিবেশগত অপরাধ।’
আইনগত দিক থেকে এই কর্মকাণ্ডকে চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাইহান কবীর জানান, ‘উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে কোনো পর্যটন কেন্দ্র বা পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় পরিবেশ ধ্বংসকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। বালু উত্তোলনের ইজারা নিয়ে পাথর তোলা চুক্তির শর্তের চরম লঙ্ঘন এবং ফৌজদারি অপরাধ। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন বেআইনি কাজ চললে তা আইনের শাসনের ওপর আঘাত হিসেবেই বিবেচিত হয়।’
এদিকে, এ ঘটনার প্রতিবাদে সরব হওয়া গোয়াইনঘাট প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. মঞ্জুর আহমদের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি একদিনের মাথায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় এলাকায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, প্রভাবশালী চক্রের চাপে তাকে পিছু হটতে হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য কঠোর বার্তার কথা শোনা যাচ্ছে। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, ‘ইজারাদারকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই পাথর উত্তোলন করা যাবে না। আমরা তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছি, অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক মোড়লও জানিয়েছেন, পরিবেশ রক্ষায় পুলিশ নজরদারি বৃদ্ধি করছে।
সচেতন মহলের মতে, বিছনাকান্দি কেবল সিলেটের সম্পদ নয়, এটি জাতীয় সম্পদ। প্রশাসনের কাগুজে সতর্কবার্তায় পাথরখেকো চক্র থেমে থাকবে না; এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত ও কঠোর উচ্ছেদ অভিযান। অন্যথায়, ‘পাথরের স্বর্গ’ বিছনাকান্দি অচিরেই পরিণত হবে এক বিরাণভূমিতে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
