সিলেট

গোয়াইনঘাটে ভুয়া স্ক্রিনশটের ফাঁদে ছাত্রদল নেতারা

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিবেদক · মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ · রাত ১২:২৬ · ৯৭৬ ভিউ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘ডিপফেক এআই’ (Deepfake AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার এবার পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূল রাজনীতিতেও। প্রযুক্তির সাহায্যে বাস্তবতার চেয়েও নিখুঁত মিথ্যা তৈরি করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এক ভয়ংকর নজির তৈরি হয়েছে সিলেটের গোয়াইনঘাটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথিত হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের ভুয়া স্ক্রিনশটের ফাঁদে পড়ে দলীয় শোকজের মুখে পড়েছেন ৬ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব। অথচ তথ্যযাচাইয়ে বেরিয়ে এসেছে—ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া স্ক্রিনশটগুলো মূলত এআই দিয়ে তৈরি একটি পরিকল্পিত ডিজিটাল ফাঁদ।

সম্প্রতি ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার কথিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের কিছু স্ক্রিনশট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর ও শৃঙ্খলাবিরোধী নানা বার্তা তুলে ধরা হয়। বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সিলেট জেলা ছাত্রদল নড়েচড়ে বসে এবং সোমবার (১৯ অক্টোবর) ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ ৮ নেতাকর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয়।

স্ক্রিনশটগুলো ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে ‘একুশে সিলেট ফ্যাক্টচেক টিম’। তাদের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছড়িয়ে পড়া হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের ছবিগুলো কোনো বাস্তব কথোপকথন নয়; বরং তা ‘ডিপফেক’ এবং আধুনিক এআই প্রযুক্তির সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে।

সাধারণ চোখে একে আসল মনে হলেও ফ্রেমের গঠন, ফন্টের বিন্যাস এবং ডিজিটাল প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন, নেতাদের সামাজিকভাবে হেয় করা এবং চাঁদাবাজ ট্যাগ দিয়ে কোণঠাসা করতেই এই সাইবার চক্রান্তের আশ্রয় নিয়েছে একটি অসাধু চক্র। ডিজিটাল এই অপপ্রচারের জের সরাসরি আঘাত হেনেছে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর।

এরপ্রেক্ষি সিলেট জেলা ছাত্রদল সোমবার (১৯ অক্টোবর) একটি বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। শোকজপ্রাপ্তরা হলেন—ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি নাজিম উদ্দীন, সিনিয়র সহ-সভাপতি জামাল উদ্দীন, সহ-সভাপতি বেলাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ হেলু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রব্বানী, নাজমুল ইসলাম মান্না, শাহরিয়াদ আহমদ ও নাজমুল হাসান নাইম।

পুরো ঘটনাকে স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রযুক্তিগত ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি নাজিম উদ্দীন। তাঁর মতে, সীমান্তে চলা অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ফতেপুর বাজার দিয়ে নিয়মিত চলাচল করা পরিবহন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে এলাকায় জনমত গড়ে তোলায় একটি প্রভাবশালী চক্র তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়।

নাজিম উদ্দীন জানান, স্থানীয় সেই বিরোধের জেরে চক্রটি তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি দলীয় পদ ছিনিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। সরাসরি বিরোধে সুবিধা করতে না পেরে তারা এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে ফেক আইডির মাধ্যমে এসব বানোয়াট স্ক্রিনশট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়, যাতে দলকে বিভ্রান্ত করে নেতাদের সাংগঠনিকভাবে নিঃশেষ করে দেওয়া যায়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গোয়াইনঘাটের এই ঘটনাটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এক মারাত্মক সতর্কবার্তা। ডিপফেক বা জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে এখন ঘরে বসেই যে কারও নামে ভুয়া অডিও, ভিডিও কিংবা মেসেজের স্ক্রিনশট তৈরি করে অপরাধী সাজিয়ে দেওয়া সম্ভব। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রযুক্তির এই অপপ্রয়োগ যদি অবাধে চলতে থাকে এবং সত্যতা যাচাই ছাড়াই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো নিরীহ নেতাকর্মী এমন ডিজিটাল ফাঁদের শিকার হতে পারেন।

এখন সবার দৃষ্টি সিলেট জেলা ছাত্রদলের দিকে—আগামী ৪৮ ঘণ্টার শুনানিতে প্রযুক্তির এই অন্ধকার দিকটি কতটা গুরুত্ব পায় এবং এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া তথ্যের বিভ্রান্তি কাটিয়ে জেলা নেতৃত্ব সত্য উন্মোচন করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত সংবাদ