সিলেট

জকিগঞ্জের ব্যবসায়ী নুমান উদ্দিনের মৃত্যুর এক বছর: থানা থেকে সিআইডি, তবুও মিলেনি হত্যারহস্যের জট

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
একুশে সিলেট · বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ · সন্ধ্যা ৭:১৪ · ২০৭ ভিউ

সিলেটের জকিগঞ্জের আলোচিত ব্যবসায়ী নুমান উদ্দিনের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এক বছর ধরে তদন্ত চলছে। থানা পুলিশের পর মামলাটি এখন অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির হাতে। কিন্তু এখনো নুমান উদ্দিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, কারা জড়িত এবং হত্যার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি।

এ ঘটনায় তাঁর শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। তবে এক বছর পরও তিনিই একমাত্র গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি। এ নিয়ে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, দীর্ঘ তদন্তের পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় মানুষের মধ্যে তদন্ত নিয়ে হতাশা তৈরি হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে জকিগঞ্জের কালিগঞ্জ বাজারে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যান নুমান উদ্দিন। সেদিন তিনি দোকান খোলেন। পরে তাঁর মোবাইল ফোন পাশের ব্যবসায়ী আব্দুস সালামের দোকানে পাওয়া যায়। এরপর তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

নুমান উদ্দিন বাড়ি না ফেরায় পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁর স্ত্রী জকিগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির নম্বর ১২৬২। এরপর পরিবার ও স্থানীয়রা তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন। পরদিন ১ অক্টোবর স্থানীয় শায়লা স্মৃতি হাসপাতালের পেছনের ধানক্ষেত থেকে পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নুমান উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তাঁর পারিবারিক ও সম্পত্তিগত বিরোধের বিষয়ও সামনে আসে। অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরোনো বাড়ির জায়গা নিয়ে নুমান উদ্দিন ও তাঁর চাচাতো ভাইদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।

নুমান উদ্দিন অসুস্থ থাকায় তাঁর জায়গা উদ্ধারের জন্য স্ত্রী মনোয়ারা বেগম উপজেলা নির্বাহী আদালতে মামলা করেন। মামলাটি ১৯/২৪ নম্বর। এর পর তাঁর চাচাতো ভাইদের পক্ষ থেকে সালমা বেগমকে বাদী করে নুমান উদ্দিন ও তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে জুডিশিয়াল আদালতে পাল্টা স্বত্ব মামলা করা হয়। মামলাটি ৮/২৫ নম্বর।

নথি অনুযায়ী, নুমান উদ্দিন নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর ওই মামলায় সর্বশেষ জবাব দাখিলের দিন নির্ধারিত ছিল। ফলে সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে ওঠে।

স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, নুমান উদ্দিন, তাঁর ভাই রিয়াজ উদ্দিন ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্য একাধিকবার সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।

অনুসন্ধানে ২০১২ সালের একটি পুরোনো পারিবারিক বিরোধের বিষয়ও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময় নুমান উদ্দিন ও তাঁর ভাই রিয়াজ উদ্দিন প্রবাসে ছিলেন। তখন রিয়াজের স্ত্রী রাবেয়া বেগমকে ঘিরে পাশের গ্রামের শাহ আলম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল বলে স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও এ বিষয়ে এক নয়।

নুমান উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নিহতের পরিবার ও তাঁর ভাইয়ের পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

নিহতের মেয়ে ও মামলার বাদী জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নি এবং তাঁর মা মনোয়ারা বেগমের বক্তব্যে কয়েকজন ব্যক্তিকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নুমান উদ্দিনের সঙ্গে শাহ আলম ও ইসলাম উদ্দিনসহ কয়েকজনের বিরোধ ছিল। তাঁকে দোকানে গিয়ে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল বলে তাঁরা দাবি করেন।

মুন্নির দাবি, তাঁদের পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় তাঁর মামা হানিফ উদ্দিন সুমনকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাঁর আরও দাবি, মামলার আসামি জামিল আহমদ ঘটনার পরদিন বিদেশে চলে যান এবং শাহ আলম ব্যবসা গুটিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তাধীন।

অন্যদিকে নুমান উদ্দিনের শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমন তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, “সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে” তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছিল।

সুমন জানান, প্রথমে তিনি মামলার সাক্ষী ছিলেন। পরে তাঁকেই আসামি করে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, রিমান্ডে তাঁর কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো বিভিন্ন তথ্য কাগজপত্রের মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করতে পেরেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে নুমান উদ্দিনের ভাই রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বেগম অবশ্য সুমনকেই নুমান উদ্দিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্য, সুমন অপরাধী না হলে পুলিশ তাঁকে কেন গ্রেপ্তার করেছিল—এ প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই পাওয়া উচিত।

রিয়াজের পক্ষের লোকজন নিহতের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও শিহাব উদ্দিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন। তবে অনুসন্ধানে ওই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে নুমান উদ্দিনের মাথায় আঘাতের চিহ্ন এবং মস্তিষ্কের ডান পারিয়েটাল অংশে প্রায় ১৫০ সিসি সাবডুরাল হেমাটোমা পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামতে মাথায় আঘাতজনিত সাবডুরাল হেমাটোমা ও শকের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুর ধরন হিসেবে প্রতিবেদনে ‘Homicidal in nature’ উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ ময়নাতদন্তের চিকিৎসা মতামত অনুযায়ী, নুমান উদ্দিনের মৃত্যু স্বাভাবিক কারণে হয়নি।

এদিকে নথি অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর নুমান উদ্দিনের ভাই রিয়াজ উদ্দিন ও শাহ আলম পুলিশ হেডকোয়ার্টারে একটি দরখাস্ত দেন। সেখানে নুমান উদ্দিনকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয় এবং শ্যালক সুমনের কাছ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার আবেদন করা হয়।

তবে ময়নাতদন্তের আগে ওই দরখাস্তে মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে কীভাবে এমন দাবি করা হয়েছিল, তা নিয়েও নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে সন্তুষ্ট না হয়ে মামলার বাদীপক্ষ মামলাটি অন্য সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের আবেদন করে। পরে আদালতের মাধ্যমে মামলাটি জকিগঞ্জ থানা থেকে সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়।

২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি সিআইডি মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক সালেক আহমদ জানিয়েছেন, তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

তবে তদন্তের এক বছর পার হলেও এখনো নুমান উদ্দিনের মৃত্যুর পেছনে কারা ছিল, কী ছিল হত্যার উদ্দেশ্য এবং ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি।

নুমান উদ্দিনের পরিবার ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই রহস্যের দ্রুত অবসান ঘটিয়ে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হলে তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে—এমন প্রত্যাশাও তাঁদের।

সম্পর্কিত সংবাদ