সিলেট

বিছনাকান্দিতে লুট হয় বোল্ডার, ধরা পড়ে ড্রেজার!

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
একুশে সিলেট · বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · রাত ৯:০৪ · ১৭৩ ভিউ

ভারতের মেঘালয়ের সুবিশাল পাহাড়ের ভাঁজ গলে নেমে আসা জলধারা মিলিত হয়েছে বাংলাদেশের পিয়াইন নদে। বড় বড় পাথরের শয্যায় আচ্ছাদিত এই ভূ-দৃশ্যের নাম বিছনাকান্দি। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘পাথরের বিছনা’। আর পরিবেশবাদীদের চোখে পাহাড় পাদদেশের প্রাকৃতিক ‘পাথুরে ভূ-দৃশ্য’। সেই বিছনা বা পাথুরে ভূ-দৃশ্য এখন ভঙ্গুর। চলতি বছরের বর্ষা শেষে দেখা গেছে, বড় বড় বোল্ডারের বেশির ভাগই নেই। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এই প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্যের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন পরিবেশবাদীরা।

জানা গেছে, বোল্ডার লুট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে চলছে প্রশাসনের টাস্কফোর্স অভিযান। তবে এসব অভিযানে মূলত বালু উত্তোলন যন্ত্র ড্রেজার ধরা পড়ে। সর্বশেষ গত রবিবার রাতে পরিচালিত টাস্কফোর্সের অভিযানে ১২টি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করা হয়। এ সময় বালুভর্তি একটি স্টিল বডির নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে বাহক চারজনকে আটক করা হয়। ড্রেজার মালিক কারা, এ বিষয়টিও চিহ্নিত করা হয়নি।

টাস্কফোর্স সূত্র জানায়, গোয়াইনঘাট উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকারিয়া হোসেনের নেতৃত্বে গত রবিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিছনাকান্দি জিরো পয়েন্ট, নতুন ভাঙা হাওর, বাদেভাশা বাজার, মনোরতল বাজার ও গোরাগ্রাম এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আটক চারজনের মধ্যে তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যজনকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

পর্যটন পরিচিতির জন্য বিখ্যাত হলেও বিছনাকান্দি সিলেটের তালিকাভুক্ত বালু ও পাথরমহাল। পাথরমহাল বন্ধ থাকলেও বালুমহাল বর্তমানে ইজারাধীন। বালুর সঙ্গে চলে পাথর লুট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বোল্ডার লুটের পেছনে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সীমান্তঘেঁষা হাদারপাড় বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চক্র চোরাচালানের পাশাপাশি বিছনাকান্দি ও আশপাশের এলাকা থেকে বড় বড় বোল্ডার পাথর লুটে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত। বড় আকৃতির বোল্ডারই লুটেরাদের মূল টার্গেট। ছোট পাথরের তুলনায় এসব বোল্ডারের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় এগুলো তুলে নেওয়া হয়। কখনো শ্রমিক দিয়ে, কখনো নৌযানের মাধ্যমে পাথর সরানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বিভিন্ন পথে সেগুলো নিয়ে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকটি গ্রুপ এতে যুক্ত থাকলেও এর পেছনে রয়েছে বড় একটি চক্র।

বিছনাকান্দি থেকে বোল্ডার লুটের ক্ষেত্রে হাদারপাড় বাজারের নাম বারবার উঠে আসছে স্থানীয়দের বক্তব্যে। তাদের অভিযোগ, সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এই বাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের চোরাচালান চলে। সীমান্তপথে পণ্য আনা-নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ পাথর ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে। বোল্ডার উত্তোলন থেকে শুরু করে পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা লোক কাজ করে। ফলে মূল হোতাদের আড়ালে রেখে নিচের সারির শ্রমিক বা পরিবহনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।

সম্প্রতি দিনে ও সন্ধ্যার পর সরেজমিনে গিয়ে লুটপাটের দুই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাদারপাড়কে কেন্দ্র করেই চক্রটি লুটপাট নিয়ন্ত্রণ করছে। হাদারপাড় পিয়াইনতীরের একটি বাজার। সেখান থেকে বিছনাকান্দির দিকে ৫ মিনিটের মতো হেঁটে গেলে ‘আনফরের ভাঙা’। সেখানে নৌকায় ওঠার সময় দেখা যায়, বিছনাকান্দি স্পটের সামনে থেকে ছোট নৌকায় করে আনা ছোট-বড় পাথর স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পাশে ট্রাক্টরে সেসব পাথর তোলা হচ্ছে।

ভারতের উমক্রেম নদের এপার ধরে অল্প সামনে এগোতেই চোখে পড়ে দুই পাড়ে তাণ্ডবের চিত্র। এক পাশে কুপারবাজারসংলগ্ন গ্রাম, অন্য পাশে শাহজালাল বাজার। দুই পাড়ই পড়েছে ভাঙনের কবলে। ভাঙনের পাশে একাধিক ভলগেট নৌকায় বালুর সঙ্গে বোল্ডার পাথরও ভর্তি করা হয়েছে। এসব পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাড়ায় চালিত বারকি নৌকা।

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পর শুরু হয় যন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলনের নামে বোল্ডার লুট। কোথাও বোল্ডার ভেঙে টুকরা করে নিয়ে যাওয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা বোল্ডারের ধারালো টুকরো।

গত প্রায় এক সপ্তাহ দিন ও রাতের ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করা স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বিছনাকান্দিতে যাতায়াতের সড়ক খারাপ থাকায় পর্যটকদের আনাগোনা কম। এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে লুটেরা চক্র। বোল্ডার লুটে শুধু বিছনাকান্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে না, বদলে যাচ্ছে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠনও। বড় পাথরগুলো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেগুলো তুলে নেওয়ায় কোথাও গভীর গর্ত তৈরি হচ্ছে, কোথাও পরিবর্তিত হচ্ছে স্রোতের গতিপথ।

ড্রেজার ধরে মালিককে বের করলেই বোল্ডার লুটকারীরা নাগালে আসত বলে মনে করছেন পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেটের সদস্যসচিব আব্দুল করিম চৌধুরী কিম। তা না হলে বিছনাকান্দির ‘পাথুরে ভূ-দৃশ্য’ ভেঙে পড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিছনাকান্দির প্রাকৃতিক আকর্ষণের মূলে রয়েছে তার পাথুরে ভূ-দৃশ্য। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির সঙ্গে ছড়িয়ে থাকা বিশাল বোল্ডারই তৈরি করেছে এখানকার অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সেই বোল্ডার সরিয়ে নেওয়া হলে শুধু একটি পাথর হারায় না, হারিয়ে যায় প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্যের অংশও।’

এদিকে কী পরিমাণ বোল্ডার লুট হয়েছে, এর কোনো পরিসংখ্যান স্থানীয় প্রশাসনে নেই। গতকাল সোমবার জানতে চাইলে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, ‘পাথরমহাল বন্ধ। বিছনাকান্দি থেকে পাথর তোলার কোনো সুযোগ নেই। তার পরও আমরা খবর নেব। যদি উত্তোলন হয় তাহলে অভিযান চালাব।’

সম্পর্কিত সংবাদ