বিশেষ প্রতিবেদন

অভিযোগের পাহাড় সোবহানীঘাট ফাঁড়ির এসআই শিপলুর বিরুদ্ধে: সিলেটে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক · বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ · ১২:৩০ এএম · ২৭৩ ভিউ

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শিপলু চৌধুরী। তার নাম শুনলেই স্থানীয়দের মনে ভেসে ওঠে বিতর্ক আর রহস্যের এক জমাট ছবি। মাদক কারবারি থেকে শুরু করে চোরাকারবারিদের সঙ্গে সখ্য—অভিযোগের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের মিছিলে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘জিরা বাণিজ্য’। গত ৪ জুলাই বৃষ্টির রাতে ভারতীয় অবৈধ জিরাবাহী পিকআপ আটকের পর বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে তা ছেড়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য এখন সিলেটের ‘টক অব দ্য টাউন’।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ৪ জুলাই রাত ১১টার দিকে সিলেট নগরীর নাইওরপুলস্থ এসএ পরিবহনের সামনে ভারতীয় অবৈধ জিরাবোঝাই একটি পিকআপ আটক করে এসআই শিপলুর নেতৃত্বে একদল পুলিশ। মুষলধারে বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে রাস্তার ওপরই শুরু হয় দরকষাকষি। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, প্রায় আধা ঘণ্টা পিকআপটি আটকে রেখে চলে সমঝোতার খেলা। কালিঘাটের এক প্রভাবশালী চোরাকারবারি চক্রের হয়ে ‘শরীফ’ নামের এক ব্যক্তি এসআই শিপলুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

অভিযোগ উঠেছে, ফাঁড়ির বিতর্কিত ‘সোর্স’ হিসেবে পরিচিত মানিক ইয়াহিয়ার মাধ্যমে পুরো দফারফার মধ্যস্থতা করেন। শেষমেশ ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় রফাদফা হওয়ার পর ‘পারভেজ’ নামের এক ব্যক্তির সরবরাহ করা একটি জাল নিলামের কাগজ দেখিয়ে রহস্যজনকভাবে অবৈধ জিরাবাহী পিকআপটি ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে এভাবে অবৈধ পণ্য নির্বিঘ্নে চলে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

শিপলু চৌধুরীর বিতর্কিত ভূমিকার আরও একটি নজির রয়েছে সম্প্রতি নাইওরপুল এলাকায় এসএ পরিবহণের ভেতর ৭০ বস্তা ভারতীয় জিরা জব্দের ঘটনায়। মামলার এজাহারে জব্দকৃত পণ্যের সঙ্গে নিলামের কাগজের অসঙ্গতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও, রহস্যজনক কারণে মূল হোতা আব্দুস সাত্তার খান মিন্টুকে আটক করা হয়নি। বরং অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি প্রক্রিয়ার এই চরম গাফিলতি নিয়ে খোদ পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরেই হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।

স্থানীয়দের দাবি, এসআই শিপলুকে ফাঁড়িতে পাওয়া যেন এক দুর্লভ ব্যাপার। ফাঁড়ির চেয়ে পাশের ‘আল-করিম হোটেল’-এই তার সময় কাটে বেশি। সেখানেই চলে অপরাধ জগতের বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে দীর্ঘ গোপন বৈঠক। গভীর রাত পর্যন্ত চলা এসব বৈঠকের ফলশ্রুতিতেই সোবহানীঘাট-কালিঘাট এলাকা চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করার এক অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে এসআই শিপলুর মাঝে। অভিযোগ রয়েছে, একজন সাব-ইন্সপেক্টর হওয়া সত্ত্বেও তিনি বেশিরভাগ সময় নির্ধারিত ইউনিফর্ম ছাড়াই অভিযানে অংশ নেন। পুলিশের চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন করে সিভিল পোশাকে তার এই বিচরণ নিয়ে ক্ষুব্ধ সহকর্মীরাও। একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কমিশনার থেকে শুরু করে সবাই যখন ইউনিফর্ম পরে শৃঙ্খলার উদাহরণ তৈরি করছেন, তখন একজন এসআই কীভাবে দিনের পর দিন সিভিল পোশাকে কাজ করেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

এসআই শিপলুর অতীতও কলঙ্কিত অধ্যায়ে ঘেরা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তিনি দক্ষিণ সুরমা থানার সেকেন্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ৪ আগস্ট হুমায়ুন রশীদ চত্বর ও কদমতলী এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত বেপরোয়া। ওই দিনের সহিংসতায় অসংখ্য মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় তার সক্রিয় ভূমিকার কথা আজও ভোলেনি সিলেটবাসী।

জিরাবাহী ট্রাক ছাড়ার অভিযোগসহ এসব নানামুখী বিতর্কের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসআই শিপলু চৌধুরীর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিস্তারিত লিখে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

সিলেটের সচেতন মহলের দাবি, সোবহানীঘাট ফাঁড়ির এই বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। জনবান্ধব ও স্বচ্ছ পুলিশি সেবা নিশ্চিত করতে এবং পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের স্পর্শকাতর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।
নাইওরপুলে বৃষ্টির রাতে পুলিশের ‘জিরা বাণিজ্য’: ফের আলোচনায় বিতর্কিত এসআই শিপলু

সম্পর্কিত সংবাদ