মেঘালয়ের আকাশে কালো মেঘ জমলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সিলেটের সীমান্ত উপজেলা গোয়াইনঘাটে। পাহাড়ি ঢল আর আকস্মিক বন্যার স্মৃতি যেন আজও তাড়া করে ফেরে ডাউকি নদীর তীরবর্তী হাজারো মানুষকে। প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষা এলেই উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্তের জনপদজুড়ে। স্থানীয়দের ভাষায়— “মেঘালয়ের মেঘ মানেই ডাউকিপারের কান্না।”
ছবির মতো মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত গোয়াইনঘাটের জাফলং ও আশপাশের এলাকা। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের নদীভাঙন, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার নির্মম বাস্তবতা। গত তিন দশকে ডাউকি নদীর ভয়াল ভাঙনে বিলীন হয়েছে শত শত বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও জনপদের অবকাঠামো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট অঞ্চলে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রথম বড় আঘাত লাগে গোয়াইনঘাটে। ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা উমগট নদী জাফলং সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। একটি পিয়াইন, অন্যটি ডাউকি নদী নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা পলি ও বালুতে পিয়াইন নদীর উৎসমুখ ভরাট হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন যুগেও নদীটি পুনঃখননের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে উজানের প্রায় সব ঢলের পানি এখন ডাউকি নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। অতিরিক্ত পানির চাপে প্রতিবছর নদীর দুই তীর ভেঙে নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে ডাউকি নদীর তীরবর্তী অন্তত ছয় থেকে সাতটি গ্রামের আড়াই শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। একই সঙ্গে হারিয়ে গেছে শত শত একর কৃষিজমি এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের মমিনপুরে ২৭টি, ছৈলাখেল অষ্টমখণ্ডে ১৯টি, আসামপাড়ায় ৩৩টি, নয়াগাঙের পাড়ে ৪৯টি, বাউরবাগে ১৩টি, বাউরবাগ হাওরে ৪২টি এবং বাউরবাগ হাওরের পূর্বপাড়ে প্রায় ৬৯টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডাউকি নদীর ভাঙন এখন শুধু নদীতীরের মানুষের সমস্যা নয়; এটি গোয়াইনঘাটের সামগ্রিক অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর সরকারি অর্থ ব্যয়ে মেরামত করা সড়কের বড় অংশই বর্ষা শেষে আবার নদীগর্ভে হারিয়ে যায়।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ডাউকি নদীর উৎসমুখ থেকে বাংলাবাজার পর্যন্ত স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিদ্যমান প্রকল্পে নতুন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে ডাউকি নদীর স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ও পিয়াইন নদীর উৎসমুখ পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হলে সীমান্ত অঞ্চলের হাজারো মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে। অন্যথায় মেঘালয়ের আকাশে প্রতিবার মেঘ জমলেই ডাউকিপারের মানুষের কান্না থামবে না।
