সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ডৌবাড়ী ইউনিয়নের হাকুর বাজার থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি সংস্কারের মাত্র দুই মাসের মাথায় আবারও আগের মতো বেহাল ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় সরকারের বিশাল অংকের বাজেট লুটপাট হয়েছে, যার চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তিন ইউনিয়নের হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে। তবে এই অভিযোগের বিপরীতে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং সামাজিক অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এই সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হয়। মোট ৮৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আরিফ ট্রেডার্স’, যার স্বত্বাধিকারী এনাম উদ্দিন তাপাদার। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকৌশলী মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে নিম্নমানের কাজ মেনে নিয়েছেন এবং তড়িঘড়ি করে ঠিকাদারকে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার মতো রানিং বিল উত্তোলনে সহযোগিতা করেছেন। বাসিন্দাদের অভিযোগ—বিটুমিন ও পাথরের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় প্রথম বৃষ্টির ছোঁয়াতেই পুরো রাস্তা ধুয়েমুছে একাকার হয়ে গেছে এবং এখানে বাস্তবে ৫০ লক্ষ টাকার কোনো কাজই হয়নি।
দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রকৌশলী হাসিব আহমেদ বলেন, “এটি জিওবি মেইনটেন্যান্স বা মেরামতের কাজ ছিল। ৬ কিলোমিটার রাস্তার সম্পূর্ণ আমরা মেরামত করিনি, যেখানে যতটুকু ভাঙা ছিল সেখানে ইটের খোয়া ও কার্পেটিং করা হয়েছে। ’
তিনি আরও জানান, ঠিকাদার কাজ শেষ করার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় কাজ পুরোপুরি সমাপ্তই হতে পারেনি। মে মাসে ঠিকাদার যখন কাজ করতে আসে, তখন থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে তিনি নিজেই কাজ বন্ধ করে দেন। রাস্তা দ্রুত নষ্ট হওয়ার পেছনে তিনটি মূল কারণ উল্লেখ করেন প্রকৌশলী বলেন, রাস্তার দুই পাশের বাসিন্দারা বাড়িঘর করার জন্য রাস্তা থেকে উঁচুতে মাটি ফেলেছেন, যার ফলে বৃষ্টির পানি নামার কোনো সুযোগ নেই।রাস্তার একদম ঘেঁষে স্থানীয়দের বাঁশঝাড় ও গাছপালা রয়েছে, যা রাস্তার উপর ঝুলে থাকে এবং পানি শুকাতে বাধা দেয়। রাস্তাটি অত্যন্ত সরু হওয়ায় দুটি বড় গাড়ি ক্রস করার সময় চাকা শোল্ডারে (রাস্তার পাশে) নেমে যায়। শোল্ডারে মাটি না থাকায় পুরো রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রকৌশলী হাসিব আহমেদ স্পষ্ট করে বলেন, ‘ঠিকাদারকে কোনো ফাইনাল বিল দেওয়া হয়নি, কেবল কাজের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ (প্রায় ৪৪-৪৭ লাখ টাকা) রানিং বিল দেওয়া হয়েছে। বর্ষা মৌসুম পার হলে ঠিকাদার নিজ দায়িত্বে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আবার মেরামত করে দিতে বাধ্য থাকবেন।’ তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এই ধরণের সমস্যা এড়াতে কার্পেটিংয়ের পরিবর্তে ইউনিব্লক বা আরসিসি রাস্তা করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আর্থিক লেনদেনেরবিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়ান। মানুষের ক্ষোভ থেকে এগুলো বলছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আরিফ ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী এনাম উদ্দিন তাপাদার আর্থিক লেনদেনের (ঘুষ) বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, ‘বৃষ্টি এবং রাস্তার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকার কারণেই মূলত রাস্তাটি দ্রুত সংস্কারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে আমাদের এই কাজের মেয়াদের সময়সীমা প্রায় এক বছর থাকে। আমরা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি না, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় রাস্তাটি যথাযথভাবে সংস্কার করে দেওয়া হবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জানা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন এবং বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
