চোরাকারবারিরা সাধারণত মূল সড়ক এড়িয়ে পুলিশকে ফাঁকি দিতে বিভিন্ন ‘বাইপাস’ বা বিকল্প পথ ব্যবহার করে—জৈন্তাপুর থানার ওসির এমন মন্তব্য এবং চোরাচালান রোধের মূল দায়িত্ব বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি), আর রাস্তায় গাড়ি চলাচলের বিষয়টি থানার এক্তিয়ারভুক্ত—উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) এমন বক্তব্য সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে চোরাচালান ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের সমান্তরালে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন ভারতীয় অবৈধ পণ্য, গবাদি পশু, জিরা, মাদক ও অস্ত্রের পাশাপাশি মানবপাচারের মতো অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, মাঠপর্যায়ের এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জৈন্তাপুর থানা এলাকায় বর্তমানে কথিত কয়েকজন ‘লাইনম্যান’ পুরো চোরাচালান ও মানবপাচার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে এই চক্রটি প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পারাপার ও চোরাচালানের মালামাল থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদা ও মাসোহারা আদায় করছে।
এই চক্রের এক সদস্যের রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয়ে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও যার আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল, কথিত এই লাইনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাত্র দুই বছর পর সে এখন জৈন্তাপুরে তিনতলা বিলাসবহুল বাড়ির মালিক। জৈন্তাপুর বাজারেও তার তিনটি দোকান রয়েছে এবং বর্তমানে সে কোটি কোটি টাকার মালিক।’
তবে এই সম্পদের আইনগত বৈধতা বা উৎস নিয়ে কোনো তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জৈন্তাপুরের কাঁঠালবাড়ী ও ঝিঙ্গাবাড়ীসহ বিভিন্ন সীমান্ত রুট ব্যবহার করে ভারত থেকে চিনি, সুপারি, কসমেটিকস, শাড়ি, কম্বল, জিরা ও মাদক প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে শত শত অবৈধ গবাদি পশু (গরু ও মহিষ) বাংলাদেশে নিয়ে আসা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মালামাল বহনের জন্য ব্যবহৃত মালবাহী গাড়িগুলো দিনদুপুরে কিংবা রাতের আঁধারে মূল সড়ক ও নবস্থাপিত চেকপোস্টের সম্মুখ দিয়েই যাতায়াত করে। গরু-মহিষের বড় বড় চালান প্রধান সড়ক দিয়ে দাপিয়ে নিয়ে যাওয়ার চিত্রও দেখা যায়। বাসিন্দাদের দাবি, ভারতীয় অবৈধ গবাদি পশু একবার স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করাতে পারলেই সেগুলোকে দেশি পশু হিসেবে বৈধ করার একটি প্রক্রিয়া সচল রয়েছে। একই সঙ্গে এই রুট ব্যবহার করে টাকার বিনিময়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মানবপাচারের বাণিজ্যও চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ৪ জুলাই জৈন্তাপুর উপজেলা গেটের সামনে দিয়ে ভারতীয় মহিষ বাজারে প্রবেশের সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায়ের বাজার মনিটরিংয়ের ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বাজারে সন্দেহভাজন ১৯টি ভারতীয় মহিষকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুঞ্জন উঠলে প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলে সচেতন মহল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায় জানান, তিনি মূলত নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে সন্দেহভাজন ১৯টি মহিষ দেখে কাগজপত্র যাচাই করা হয়। ব্যবসায়ীরা কাস্টমস ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সামনে বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পর সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। চোরাচালান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চোরাচালান রোধের মূল দায়িত্ব বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি)। আর রাস্তায় গাড়ি চলাচল বা আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি থানার এক্তিয়ারভুক্ত। বিজিবি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখনই আমাদের সহযোগিতা চাইবে, আমরা টাস্কফোর্স পরিচালনা করতে প্রস্তুত আছি।’
চেকপোস্ট ও থানার সামনে দিয়ে চোরাচালানের গাড়ি যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘চোরাকারবারিরা সাধারণত মূল সড়ক এড়িয়ে পুলিশকে ফাঁকি দিতে বিভিন্ন বাইপাস বা বিকল্প পথ ব্যবহার করে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি এবং নিয়মিত কাগজপত্র যাচাই করছি।’
পুলিশের নামে ‘লাইনম্যান’ নিয়োগ করে টাকা তোলার বিষয়টি অস্বীকার করে ওসি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘লাইনম্যান বিষয়টি কী, তা আমার জানা নেই। এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই, তবে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।’
এদিকে, জুলাইয়ের শুরুতে কাঁঠালবাড়ী ও ঝিঙ্গাবাড়ী সীমান্ত এলাকা থেকে ৪টি ভারতীয় এয়ারগান উদ্ধার করে বিজিবি। তবে কোনো চোরাকারবারিকে আটক না করে সেগুলো ‘পরিত্যক্ত’ হিসেবে উদ্ধার দেখানো হয়। এ বিষয়ে এবং কথিত লাইনম্যানদের তৎপরতা নিয়ে জানতে জৈন্তাপুর রাজবাড়ী বিওপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হকের সরকারি নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, সীমান্তে চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে লোকদেখানো অভিযানের পরিবর্তে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কঠোর ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে কথিত ‘লাইনম্যান’ সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
