বিশেষ প্রতিবেদন

‘একুশে সিলেট’-এর সংবাদ প্রকাশ

গোয়াইনঘাটে টাস্কফোর্সের অভিযানে ১৬ ড্রেজার ধ্বংস, জরিমানা ১ লাখ

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিবেদক · বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬ · ১:১২ এএম

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় পিয়াইন নদী ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে টাস্কফোর্স। জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘একুশে সিলেট’-এ ‘৩১ কোটির ইজারা, ক্ষতি শতকোটির’ এবং ‘হাজীপুরে বালু সন্ত্রাসের আড়ালে ধ্বংসের মহোৎসব’ শীর্ষক দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়।

গোয়াইনঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকারিয়া হোসেনের নেতৃত্বে উপজেলার লাঠি গ্রাম, নতুনবাজার, হাজিপুর এবং লুনী গ্রামে এই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। অভিযানকালে অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ১৬টি ড্রেজার মেশিন ও বালুবাহী নৌকা স্পটেই ধ্বংস করা হয়। এছাড়া বালু স্থানান্তরের জন্য ব্যবহৃত ১৫টি প্লাস্টিক ও লোহার পাইপ ভেঙে বিকল করে দেওয়া হয়। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে অপরাধের দায়ে দুই ব্যক্তিকে আটক করে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর একটি চৌকস টিম যৌথভাবে সার্বিক সহায়তা প্রদান করে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের নবসৃষ্ট হাজিপুর বালু মহালের ইজারা পায় ‘মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’, যার স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহ। ইজারার শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে বালু সংগ্রহের কথা থাকলেও ইজারাদারের মদদে হাজার হাজার ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দিন-রাত বালু উত্তোলনের মহোৎসব শুরু হয়। ইজারা বহির্ভূত এলাকা উত্তর প্রতাপপুর, লুনী ও আমবাড়িতেও থাবা বসিয়েছে এই সিন্ডিকেট।

ড্রেজারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে পিয়াইন নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে জাফলং চা বাগানের ঐতিহ্যবাহী লুনী ফুটবল মাঠসহ স্থানীয় বসতবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা অমৃকা লাল ও আব্দুল জলিলরা জানান, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তারা এখন ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, কামাল মেম্বার, দেলোয়ার মেম্বার, যুবদল নেতা জুবের আহমদ, নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের কামরুল ও খাইরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট এই বালু সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে হামলা ও মামলা। সম্প্রতি এই চক্রটি স্থানীয় তোফায়েল আহমদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার বৃদ্ধ পিতার আঙুল কেটে নেয়। এছাড়া রয়্যালটির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ‘ইউনিয়ন ট্যাক্স’-এর নামে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।

অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাকারিয়া হোসেন বলেন, পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষার্থে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে। এই ধরনের অবৈধ তৎপরতা বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করব।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা হিসেবে আজকের এই অভিযান এবং এটি ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে।

প্রশাসনের এই অভিযানকে সাধুবাদ জানালেও স্থানীয়দের দাবি, লোকদেখানো সাময়িক অভিযানে কোনো স্থায়ী ফল আসবে না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এই ড্রেজার সিন্ডিকেটকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলে জাফলংয়ের পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিপন্ন পিয়াইন নদী আর নিঃস্ব হওয়া কৃষকদের বাঁচাতে উচ্চপর্যায়ের স্থায়ী হস্তক্ষেপই এখন গোয়াইনঘাটবাসীর শেষ ভরসা।

সম্পর্কিত সংবাদ