সিলেট

অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন

দিনে সোনাইয়ের বালু, রাতে শাহ আরেফিনের পাথর—ধ্বংসের মুখে সড়ক

কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি
কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রতিবেদক · রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ · রাত ৯:২৯ · ১৮৯ ভিউ

দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সোনাই নদী থেকে বালু পরিবহনের ব্যস্ততা। রাত গভীর হলেই শুরু হয় পাথর পরিবহনের তোড়জোড়। একের পর এক ট্রাক্টর ও ট্রলি ছুটে চলে গ্রামের সরু সড়ক দিয়ে। ভারী যানবাহনের অবিরাম চলাচলে একসময়ের পাকা সড়ক এখন পরিণত হয়েছে খানাখন্দে ভরা বিপজ্জনক পথে।

এ চিত্র সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নভাগী গ্রামের। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় সোনাই নদীর বালু এবং রাত ১২টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর পরিবহনে ট্রাক্টর-ট্রলির চলাচল বেড়ে যায়। এসব ভারী যানবাহনের চাপে গ্রামের সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও উঠে গেছে ইট, কোথাও ভেঙে গেছে পাকা অংশ। সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ধুলাবালি।

ফলে সড়কটি এখন স্থানীয়দের স্বাভাবিক চলাচলের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাত ১২টার পর থেকে গ্রামের সড়কে ট্রাক্টর ও ট্রলির চলাচল বেড়ে যায়। একটির পর একটি ভারী যান পাথর নিয়ে ছুটে চলে। ভোর পর্যন্ত চলে এই ব্যস্ততা।

অন্যদিকে দিনের বেলায় সোনাই নদী থেকে বালু পরিবহনে একই সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সড়কের ওপর ভারী যানবাহনের চাপ থাকছে।

সরু গ্রামীণ সড়কগুলো এমন ভারী যানবাহনের চাপ নেওয়ার উপযোগী না হলেও নিয়মিত ট্রাক্টর-ট্রলি চলাচলের কারণে সড়কের স্থায়িত্ব দ্রুত কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন সাত থেকে আটটি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করেন। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাইকে প্রতিদিন এই পথ ব্যবহার করতে হয়।

কিন্তু সড়কের বেহাল দশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহন চলাচলেও তৈরি হয়েছে ঝুঁকি। কোথাও গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে যানবাহন কাত হয়ে পড়ছে, আবার কোথাও ধুলাবালির কারণে দৃষ্টিসীমা কমে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অসুস্থ রোগী ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীদের। রাতের বেলায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে জানান স্থানীয়রা।

সড়কের এমন দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বালু ও পাথর পরিবহনে গ্রামের সড়ক ব্যবহার করা হলেও সড়ক রক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটা আর রাস্তা নয়, পাথরখেকোদের বানানো মৃত্যুফাঁদ।

তিনি বলেন, ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল বন্ধ করা না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কটি পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

স্থানীয়দের অভিযোগ শুধু সড়ক ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের দাবি, সোনাই নদী থেকে বালু এবং শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলন ও পরিবহনের বিষয়টি নিয়েও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

তাঁদের অভিযোগ, অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক্টর-ট্রলি গ্রামের সড়ক দিয়ে চলাচল করায় জনদুর্ভোগ বাড়ছে। এতে একদিকে সড়ক নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জননিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওসমান গণি।

তিনি জানান, বর্তমানে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন হচ্ছে না। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে লুকিয়ে রাখা পাথর বিভিন্ন মিলে বিক্রির চেষ্টা করা হলে পুলিশ সেগুলো আটকের জন্য অভিযান চালাচ্ছে।

ওসি আরও জানান, অবৈধ পাথর ও বালু পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন আটক করার পাশাপাশি গাড়ির মালিকদের তথ্য সংগ্রহ করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবিন মিয়ার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধে অভিযান চললেও গ্রামের সড়কগুলোর ক্ষতির দায় কে নেবে? ভারী যানবাহনের চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত এসব সড়ক সংস্কারে উদ্যোগই বা নেওয়া হবে কবে?

তাঁদের দাবি, বালু-পাথর পরিবহনে গ্রামের সরু সড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ চান তাঁরা।

সম্পর্কিত সংবাদ