সিলেট

৬৮ দিনের অভিযানে ওসি ওমর ফারুকের কঠোরতার ছাপ গোয়াইনঘাটে

রাজু বিশ্বাস দুর্জয়
রাজু বিশ্বাস দুর্জয়
গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি · বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · রাত ৯:৩৮ · ২৭৭ ভিউ

সিলেটের গোয়াইনঘাট। একদিকে পাহাড়, নদী আর সীমান্তঘেঁষা জনপদ; অন্যদিকে ভারতীয় সীমান্তের সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগ। ভৌগোলিক এই অবস্থান যেমন পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে অবৈধভাবে পণ্য আনা-নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এই বাস্তবতায় গোয়াইনঘাট থানায় নতুন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে মো. ওমর ফারুক মোড়লের দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদক ও চোরাচালানবিরোধী তৎপরতা জোরদার করেছে পুলিশ। গত ৩ জুলাই দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৮ দিনে সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি, টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। জাফলং, তামাবিল, রাধানগরসহ সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে ১ হাজার ২০৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের ঘটনা।

গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলার ১ নম্বর রুস্তমপুর ইউনিয়নের পাতনী এলাকায় অভিযান চালায় গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ। পুলিশের দাবি, পাতনী গ্রামের তেরা মিয়ার স্ত্রী কুটিনা বেগমের বসতঘরে বিশেষ কৌশলে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ফেনসিডিল লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ধানের গোলার নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ১ হাজার ২০৫ বোতল আমদানিনিষিদ্ধ ভারতীয় ফেনসিডিল। পুলিশের হিসাবে এসব মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৪ লাখ ১০ হাজার টাকা।

এ ঘটনায় ৭ সেপ্টেম্বর গোয়াইনঘাট থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় গ্রেপ্তার একজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ধানের গোলার নিচে এত বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল উদ্ধারের ঘটনা আবারও সামনে এনেছে সীমান্ত এলাকায় মাদক মজুত ও পাচারের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন।

গোয়াইনঘাটের মাদক ও চোরাচালান পরিস্থিতি বুঝতে হলে এর ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিতে হয়। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল, পর্যটনকেন্দ্রিক জনসমাগম এবং দুর্গম পথের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য প্রতিটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা কঠিন।

পুলিশের ভাষ্য, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র মাদক ও বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচারের চেষ্টা করে। কখনো বসতঘর, কখনো নির্জন এলাকা কিংবা বিভিন্ন আড়াল ব্যবহার করে মাদক মজুত রাখা হয়।

এ কারণে শুধু অভিযান নয়, মাদকের উৎস, পরিবহনপথ, মজুতস্থান এবং গন্তব্য—পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়লের দাবি, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচারের পাশাপাশি অবৈধভাবে পণ্য প্রবেশ ঠেকাতেও পুলিশ কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান ও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

পুলিশের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ মোকাবিলায় শুধু থানাভিত্তিক অভিযান নয়, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল বলেন, ‘গোয়াইনঘাটকে জনবান্ধব, দালালমুক্ত এবং মাদক ও চোরাচালানমুক্ত থানা হিসেবে গড়ে তোলাই পুলিশের মূল লক্ষ্য।’

তার ভাষ্য, মাদক কারবারিরা নানা কৌশলে মাদক লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তবে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের এমন অবস্থানের পর স্থানীয় সচেতন মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, সীমান্ত এলাকায় শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেই মাদক ও চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।

৩ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর—৬৮ দিনের এই সময়কে পুলিশ তাদের মাদক ও চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে এক অভিযানে ১ হাজার ২০৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের ঘটনা পুলিশের তৎপরতার দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

তবে একটি বা কয়েকটি অভিযানের সাফল্য দিয়ে সীমান্তের মাদক ও চোরাচালানের পুরো চিত্র বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ একটি চলমান ও পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যত বাড়ে, অপরাধীদের কৌশলেও পরিবর্তন আসতে পারে।

তাই গোয়াইনঘাটে পুলিশের বর্তমান তৎপরতার প্রকৃত প্রভাব নির্ধারিত হবে আগামী দিনগুলোতে। নিয়মিত অভিযান, মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতি, সীমান্তে নজরদারি এবং বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়—সব মিলিয়েই বোঝা যাবে, ৬৮ দিনের এই কঠোর অবস্থান কতটা দীর্ঘস্থায়ী ফল আনতে পারে।

গোয়াইনঘাটের সীমান্তবাসীর প্রত্যাশা, মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযান যেন কেবল কয়েক দিনের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির মাধ্যমে সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে।

সম্পর্কিত সংবাদ