সিলেটের গোয়াইনঘাটে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের ফল প্রকাশের পর নানা অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। পূর্ববর্তী বিভিন্ন শুমারির কাজে যুক্ত থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন নিয়োগবঞ্চিত ছাত্র-জনতা। এ ঘটনায় নতুন প্রার্থীদের পাশাপাশি উপজেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
বুধবার (১৩ আগস্ট) সকালে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ কমিটি চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষা নেওয়া হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিভিন্ন নির্বাচনে নৌকা মার্কার এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের অনেকেরই ঠাঁই হয়েছে। ৬ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী সুমানা আক্তার, ১১ নম্বর মধ্য জাফলং ইউনিয়নের কুলসুমা বেগম নামের এক মহিলা গ্রাম পুলিশ এবং এক গণমাধ্যমকর্মীর ভাই আল-আমিনকে এ পদে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আল-আমিনকে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবেও সামাজিক মাধ্যমে আখ্যায়িত করেছেন ছাত্রদল নেতারা। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অস্ত্র হাতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও এ তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
নিয়োগবঞ্চিত ছাত্রদল নেতারা অভিযোগ করেন, মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে ফ্যাসিস্ট আমলের শুমারির অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাহিদ হাসান নামের এক প্রার্থী বলেন, গত ১৭ বছর আমরা আওয়ামী লীগের দলীয়করণের কারণে চাকরি থেকে বঞ্চিত ছিলাম। তাহলে আমাদের অভিজ্ঞতা আসবে কীভাবে? এমন অভিজ্ঞতাকেই মূল মাপকাঠি বানানো হয়েছে, যেখানে পুনর্বাসিত হচ্ছে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ও মামলার আসামিরাও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় রাজনীতি ও তরুণ সমাজের প্রতিনিধিরা। জাসাস গোয়াইনঘাট উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল আহমদ সানি ফেসবুকে লেখেন, জাফলং এলাকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতা নাহিদ হাসানকে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত এসব নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। একইভাবে ছাত্রদল নেতা ওমর ফারুকসহ অনেকে অবিলম্বে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান।
নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী মো. নুর আহমদ বলেন, মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা এই ফলাফল বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।
এই নিয়োগকে ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের অবমাননা’ হিসেবে উল্লেখ করে স্থানীয় বিক্ষোভকারীরা আজ (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৩টায় গোয়াইনঘাট উপজেলা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সভার ডাক দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রদল নেতা অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের কতিপয় নেতাকে ম্যানেজ করে অনেকেই এই নিয়োগ ভাগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ফেসবুকে শুধুমাত্র ইউএনওকে দোষারোপ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘এখানে তো ইউএনওর বাড়ি নেই, যে মুখ দেখে দেখে তিনি চাকরি দেবেন।’
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানান, ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নির্দেশিকা অনুসরণ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা পুনরায় যাচাই-বাছাই এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে নতুন তালিকা প্রস্তুত করার কথাও জানান তিনি।
স্থানীয় কয়েকজন সংবাদকর্মীও নিয়োগ পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় সচেতন নাগরিকবৃন্দের ব্যানারে গোয়াইনঘাট উপজেলা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রতিবাদ সভার আহ্বান করা হয়েছে।
