আসন্ন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিল ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও প্রাণচাঞ্চল্য। কাউন্সিলে দলের গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে নেমেছেন দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত চার হেভিওয়েট নেতা।
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা চার নেতা হলেন—বর্তমান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান বাচ্চু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হাসান রঞ্জন, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা মোস্তফা জামান এবং অপর সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু সাঈদ সুইট। তৃণমূলের সমর্থন আদায়ে ইতোমধ্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয় হয়েছেন তারা।
জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা সাইদুর রহমান বাচ্চু প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। ১৯৮৮-৮৯ ও ১৯৮৯-৯০ মেয়াদে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তিনি।
২০০৩ সালে বিএনপির মূল দলে যুক্ত হওয়ার পর শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১৬ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বাচ্চু। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৬৮টি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বন্যা ও দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণসহ সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তৃণমূল ও সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে তাঁর অনুসারীদের দাবি।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ছাত্র ও যুব রাজনীতির অভিজ্ঞতা রয়েছে রাশেদুল হাসান রঞ্জনের। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পাবনা কারাগারে নয় মাসসহ বিভিন্ন সময়ে ছয়বার এবং পরবর্তী সময়ে মোট ২১ বার কারাবরণের কথা উল্লেখ করেন তিনি। সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের দুইবার এজিএস ও একবার জিএস ছিলেন রঞ্জন। এছাড়া দীর্ঘ ১২ বছর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
রঞ্জনের দাবি, রাজনৈতিক জীবনে তিনি দুই শতাধিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা চাঁদাবাজির অভিযোগ তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে স্পর্শ করেনি বলে দাবি করেন তিনি। আগামী দিনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেকে সাধারণ সম্পাদক পদের যোগ্য ও ত্যাগী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন রঞ্জন।
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা আরেক নেতা মির্জা মোস্তফা জামান। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম মির্জা মোরাদুজ্জামানের সন্তান। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর পথচলা শুরু। পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
মির্জা মোস্তফা জামানের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রায় ৪০টি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন বলে জানান। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এই নেতা শহীদ জিয়ার আদর্শ ও তাঁর বাবার রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করে তৃণমূলের আস্থা অর্জনের প্রত্যাশা করছেন।
এদিকে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু সাঈদ সুইট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক পদে নিজের প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি সিরাজগঞ্জ বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদারের সন্তান।
সুইটের দাবি, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি ১০ মাস ডিটেনশনে ছিলেন। পরবর্তী সময়েও একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। প্রত্যক্ষ ভোটে সিরাজগঞ্জ জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বলে তাঁর সমর্থকদের দাবি।
ক্রীড়া ও সামাজিক অঙ্গনেও পরিচিত সুইট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে দলকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিলের চূড়ান্ত তারিখ ও সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, মামলা-হয়রানির অভিজ্ঞতা, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয়ই সাধারণ সম্পাদক পদে নেতৃত্ব নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
