দশ বছর আগেও ললাটে ছিল বিন্দু বিন্দু ঘাম, হাতে পাথর তোলার সরঞ্জাম ‘বারকী’। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এক অতি সাধারণ দিনমজুরের ঘরে বেড়ে ওঠা সেই যুবকটির নাম শামসুদ্দিন কালা ওরফে ‘শ্যাম কালা’। কিন্তু মাত্র এক দশকের ব্যবধানে পাল্টে গেছে জীবনচিত্র। অভাবী সেই বারকী শ্রমিক এখন সিলেটের সীমান্ত জনপদের এক মূর্তিমান আতঙ্ক এবং কোটি কোটি টাকার মালিক। গোয়াইনঘাট ও সালুটিকর সীমান্তের চোরাচালান জগতে বর্তমানে তিনি এক অঘোষিত ‘রাজা’। গোয়াইনঘাট থেকে তার হাত ধরেই ভারতীয় চোরাচালানের মালামাল ছড়িয়ে পড়ছে সিলেটসহ সারাদেশে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে ডিবির লোক পরিচয় দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি ২ জুন সালুটিকর পুলিশ ফাঁড়ির এক সফল অভিযানে প্রায় ২৬ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্যসহ একটি গাড়ি জব্দ করা হয়। নাটকীয় এই অভিযানে চতুর হেলপার পালিয়ে যেতে পারলেও পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয় চালক ইকরামুল হক রানাকে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে চালক রানা অকপটে স্বীকার করেছেন, এই বিপুল পরিমাণ মালামালের প্রকৃত মালিক অন্য কেউ নন—তিনি গোয়াইনঘাটের শীর্ষ চোরাকারবারি শামসুদ্দিন কালা। এই ঘটনার পর আবারও জনমনে প্রশ্ন জেগেছে, চালক ও পণ্য ধরা পড়লেও কেন বারবার অধরা থেকে যাচ্ছেন নেপথ্যের মূল হোতা শ্যাম কালা? চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও এই ‘রাঘববোয়াল’ কি তবে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবেন?
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাতির খাল গ্রামের দিনমজুর মোশাহিদ আলীর দ্বিতীয় ছেলে কালা মিয়া। একসময় পাথর শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও চোরাকারবারিদের সাথে সখ্য গড়ে তুলে তিনি নিজেই এখন বিশাল এক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রক। অভিযোগ রয়েছে, নিজের স্ত্রীকে ব্যবসায় সহযোগী করে এবং তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন। আড়ালে থেকে তার সহযোগী আলামিন ও লুনির মোশাহিদের মাধ্যমে সীমান্তজুড়ে কায়েম করেছেন এক নিজস্ব ‘রামরাজত্ব’।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সোনারহাট সীমান্তকে বর্তমানে চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত করেছে কালা সিন্ডিকেট। ভারতীয় শাড়ি, কসমেটিকস ও মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও মদের মতো ভয়াবহ মাদকও দেদারসে আসছে এই সিন্ডিকেটের হাত ধরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার জুবের নামক একজনের মাধ্যমে অবাধে চলছে এই কারবার। যারা প্রতিবাদ করেন, তাদের ওপর নেমে আসে ‘লাঠিয়াল বাহিনী’র নির্যাতন। কখনও ডিবি পুলিশের ভয়, কখনও বা মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা ডিবির ওসি আলী আশরাফ কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, শ্যাম কালা নামে ডিবির কোনো সদস্য নেই। ডিবির নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ কাজ করলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল জানান, চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে গোয়াইনঘাট থানা সবসময় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে আছে। অভিযুক্ত শ্যাম কালার নাম আমরা শুনেছি। তার কর্মকাণ্ডের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভাবী দিনমজুরের সন্তান থেকে আজকের ‘শীর্ষ চোরাকারবারি’ হয়ে ওঠার এই রহস্যময় উত্থানের পেছনে কারা কলকাঠি নাড়ছে এবং তাকে কারা নেপথ্যে থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ। স্থানীয়দের মতে, শ্যাম কালার মতো রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত সীমান্তের চোরাচালান ও মরণনেশা মাদক নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
