অপরাধ

যুবলীগের কামরুল-খাইরুলকে নিয়ে যুবদলের জুবেরের ‘অপরাধ সাম্রাজ্য’

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিবেদক · সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ · ৬:৪৪ এএম · ৪৫১ ভিউ

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্ত জনপদ এখন এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম। পাহাড়, নদী আর অরণ্যঘেরা এই জনপদে এখন আইনি শাসনের চেয়ে ‘জুবের বাহিনী’র তর্জন-গর্জনই যেন শেষ কথা। সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের নেতা কামরুল ইসলাম ও খাইরুল ইসলামের সাথে বিতর্কিত যুবদল নেতা জুবের আহমদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—জুবের আহমদ কি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবছেন? গোয়াইনঘাট যুবদল কি শেষ পর্যন্ত একজন ‘চোরকারবারী’র কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে?

৩০ জুন এবং ১৩ জুলাই গোয়াইনঘাটের ইজারা বহির্ভূত ‘কইনা জঙ্গল’ (কন্যা জঙ্গল) ও হাজিপুর বালু মহলে বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন। গোয়াইনঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকারিয়া হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ড্রেজার মেশিন, বালুবাহী নৌকা ও পাইপ ধ্বংস করা হয়। এ সময় ১২ জন শ্রমিককে কারাদণ্ড ও কয়েকজনকে জরিমানা করা হলেও মূলহোতারা থেকে গেছেন অধরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের খবর আগেভাগেই পেয়ে সটকে পড়েন প্রভাবশালী বালি খেকো চক্রের হোতা জুবের আহমদ এবং নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা কামরুল ও খাইরুল ইসলাম।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৩ জুলাই অভিযানের পরপরই আবারো ওই এলাকা থেকে পরিবেশ ধ্বংস করে বালি লুটপাট শুরু করেছে জুবের ও তার বাহিনী। এছাড়া আহারকান্দি, মাতুরতল ও বিজিবি নিয়ন্ত্রিত এলাকা প্রতাপুরেও তাদের ধ্বংসলীলা অব্যাহত রয়েছে।

প্রশাসনের অভিযানের পরও দমানো যায়নি জুবের বাহিনীর তান্ডব। গত ১৮ জুলাই এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হাজিপুর বালু মহালের ২৫টি বসতঘরে অতর্কিত হামলা ও কয়েক লক্ষ টাকার মালামাল লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ১০-১২ জন গ্রামবাসী। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—টাস্কফোর্সের অভিযানের পরও এই চক্র এত সাহস পায় কোথায়?

জুবেরের নৃশংসতার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে তোফায়েল আহমদ নামের এক ব্যক্তির অভিযোগে। বালুমহাল নিয়ে বিরোধের জেরে জুবেরের অনুসারীরা তোফায়েলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার বৃদ্ধ বাবার একটি আঙুল কেটে নিয়ে জুবেরকে ‘উপহার’ হিসেবে দেয়। এই পৈশাচিক অপরাধটি মাত্র ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গোয়াইনঘাট থানার এসআই ফয়েজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অথচ আইনের দৃষ্টিতে এটি একটি জামিন অযোগ্য ও অ-আপোষযোগ্য অপরাধ।

জুবের আহমদের উত্থান কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। মাত্র চার বছর আগেও জাফলং গুচ্ছগ্রাম এলাকায় তার একটি ছোট কসমেটিকসের দোকান ছিল। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সেই জুবের এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। বিলাসবহুল গাড়ি আর দুবাই-সিঙ্গাপুরে প্রমোদভ্রমণ তার নিত্যসঙ্গী। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালে বিজিবির জনৈক অসাধু কর্মকর্তার সাথে সখ্য গড়ে তুলে তিনি চোরাচালানের জগতে পা রাখেন। বর্তমানে হাজিপুর, কনাই জঙ্গল ও আহারকান্দিতে বালি লুটপাটের পাশাপাশি নকশিয়া পুঞ্জি সীমান্ত দিয়ে মদ, চিনি, গরু ও স্বর্ণ চোরাচালানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তার হাতে।

আওয়ামী লীগ আমলে জুবের ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের পিএসের ‘খাস লোক’। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে তিনি যুবদলের প্রভাবশালী নেতা সেজে বসেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হতে জোর লবিং চালাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, জেলা যুবদলের কিছু নেতাকে অনৈতিক সুবিধা এবং সিলেটের অনেক বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকে বালি ব্যবসায় অংশীদার করে সবার মুখ বন্ধ করে রেখেছেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়াইনঘাট জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা জানান, জুবের আহমদ আমাদের দলের বদনাম করছে। সিলেটের কিছু নেতার আশকারায় সে যা ইচ্ছে তাই করছে। এতে সংগঠনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। জুবেরের কাছে গোয়াইনঘাট যুবদল জিম্মি হয়ে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে লাভ হবে না, কারণ বড় বড় নেতারাও তার কাছে জিম্মি।

সিলেট নগরীর জেল রোডে বিলাসবহুল হোটেল, উপশহরের আলিশান বাড়ি আর জেলার বিভিন্ন স্থানে বিপুল বেনামি সম্পদের মালিক জুবের। অথচ তার বাবা এখনো একটি মসজিদে ইমামতি করে অতি সাধারণ জীবনযাপন করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট কার্যালয় জানিয়েছে, জুবেরের এই অস্বাভাবিক সম্পদের উৎস নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হতে পারে।

গোয়াইনঘাট থানার নবাগত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, অপরাধী যে দলেরই হোক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তোফায়েলের বাড়িতে হামলার ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে পুনরায় তদন্ত করা হবে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাহজাহান সিদ্দিকী বলেন, যুবদলের নাম ভাঙিয়ে কোনো অপকর্ম বরদাস্ত করা হবে না। জুবের যদি অবৈধ বালি লুটপাট বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় যুবদলের একটি সূত্রে জানা গেছে, গোয়াইঘাট যুবদলের সদস্য জুবের আহমদের বিরুদ্ধে উঠা নানা অভিযোগ তারা হাতে পেয়েছেন। তাছাড়া জুবেরে বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

হাজিপুর সীমান্তের এই ত্রাস জুবের এবং নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা কামরুল-খাইরুল বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে প্রশাসনের দ্রুত ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

সম্পর্কিত সংবাদ