জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের তেলিয়া গ্রামে পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘস্থায়ী ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পানি জমে থাকার কারণে গ্রামের রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় মসজিদের চারপাশেও পানি জমে থাকায় মুসল্লিদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে এলাকায় তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে এবং স্থায়ী ড্রেন নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসীর পক্ষে মোঃ রুহুল আমিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে একটি লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার সদর ইউনিয়নের তেলিয়া গ্রামে সুরমা নদীর ভাঙন রোধে নদী তীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ফ্লাড রি-কনস্ট্রাকশন ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট (FREAP) এর আওতায় তেলিয়া থেকে শাহপুর গ্রামের অংশে নদীর বাম তীরে ৫০০ মিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজের এই প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সুনামগঞ্জ পাউবো বিভাগ-১ এর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘কেসিএল-নিয়াজ-নুনা জেভি’।
অভিযোগ উঠেছে, নদী ভাঙনরোধে চলমান এই কাজে ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পাড়ে ব্লক বসানোর ক্ষেত্রে প্রায় আড়াইশ’ মিটার অংশ উঁচু করে এবং বাকি আড়াইশ’ মিটার অংশ প্রায় পাঁচ ফুট নিচু করে ব্লক বসানো হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তেলিয়া অংশে বাঁধ উঁচু এবং শাহপুর অংশে নিচু করে ব্লক বসানোর কারণে গ্রাম থেকে পানি নামার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মেজারমেন্টের চেয়ে ৫-৭ ফুট নিচে কাজ করা এবং প্রায় একশ’ ফুট জায়গা বাদ দিয়ে কাজ করার কারণে ৩৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পটির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেকোনো সময় নির্মাণাধীন বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে গিয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোরশেদ মিয়ার কাছে কাজের বিবরণ জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ঠিকাদারের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে ঠিকাদারের মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি তা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড জনসম্মুখে দৃশ্যমান থাকার কথা থাকলেও, এখানে সাইনবোর্ডটি মাটিতে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। সাইনবোর্ডে প্রকৌশলীদের নম্বর থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য মোঃ আতিকুর রহমান বলেন, “তেলিয়া ও শাহপুর বাঁধবাজার এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। অথচ নদী ভাঙন রোধের কাজে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রাখায় তেলিয়া গ্রামসহ আশপাশের বাসাবাড়িতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এখানে একটি স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হলে শতাধিক পরিবার এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে।” তিনি আরও যোগ করেন, মেজারমেন্ট পরিবর্তন করে প্রায় একশ’ ফুট জায়গা বাদ দিয়ে কাজ করায় পুরো প্রকল্পটিই এখন ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মামুন হাওলাদার বলেন, “আমি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইপের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দিয়েছি। তবে স্থানীয়ভাবে পাইপ বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা না পাওয়ায় কাজটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকাবাসী জায়গার ব্যবস্থা করে দিলে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।” নকশার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, অনুমোদিত নকশা বা ডিজাইন অনুযায়ীই তেলিয়া অংশে উঁচু এবং শাহপুর অংশে নিচু করে ব্লক বসানো হচ্ছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এই জনদুর্ভোগের স্থায়ী অবসান ঘটাতে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে তদন্তপূর্বক তেলিয়া গ্রামে স্থায়ী ড্রেন নির্মাণ করে পানি সরাসরি নদীতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
Leave a Reply