বিশেষ প্রতিবেদন

৩১ কোটির ইজারা, ক্ষতি শতকোটির

হাজীপুরে বালু সন্ত্রাসের আড়ালে ধ্বংসের মহোৎসব

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিবেদক · মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ · ৫:৪৭ এএম

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার দিগন্তজোড়া ফসলি জমি আর পিয়াইন নদীর রূপালি বালু এখন স্থানীয়দের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোটি কোটি টাকায় বালু মহাল ইজারা দেওয়া হলেও, ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে একদল প্রভাবশালী ‘বালু খেকো’ চক্রের তাণ্ডবে এখন ধ্বংসের মুখে জাফলংয়ের বিস্তীর্ণ জনপদ। ড্রেজারের গর্জনে রাতের ঘুম হারাম হয়েছে গ্রামবাসীর, আর চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও খেলার মাঠ।

চলতি বছর পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের নবসৃষ্ট হাজিপুর বালু মহালের ইজারা পায় মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ, যার স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহ। ইজারার শর্ত অনুযায়ী লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপুর মৌজা থেকে শুধুমাত্র সনাতন বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। শর্তের তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চলছে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। হাজিপুর ছাড়িয়ে ইজারা বহির্ভূত এলাকা—উত্তর প্রতাপপুর, লুনি ও আমবাড়িতেও থাবা বসিয়েছে এই সিন্ডিকেট।

ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে। বিলীন হচ্ছে শত শত বিঘা ফসলি জমি। হুমকির মুখে পড়েছে জাফলং চা বাগানের ঐতিহ্যবাহী লুনি ফুটবল মাঠসহ স্থানীয় আরও তিনটি খেলার মাঠ। স্থানীয় বাসিন্দা অমৃকা লাল, কুলন্দ নাথ, আব্দুল জলিল ও কমল নাথদের মতো অনেকের ঘরবাড়ি এখন নদী ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে। বর্ষা মৌসুম আসার আগেই তাদের চোখেমুখে এখন ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক।

বালু উত্তোলনের এই অবৈধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে, কামাল মেম্বার, বিএনপি নামধারী দেলোয়ার মেম্বার, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জুবের আহমদ এবং যুবলীগ নেতা কামরুল ও খাইরুল ইসলামের নেতৃত্বে এক বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই চক্রটি এতটাই বেপরোয়া যে, প্রতিবাদ করলেই জুটছে হামলা ও মামলা।

সম্প্রতি এই চক্রটি স্থানীয় তোফায়েল আহমদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট চালায়। এসময় বাধা দিতে গেলে তোফায়েলের বৃদ্ধ পিতার আঙুল কেটে নেয় হামলাকারীরা। এর আগে বালু তোলায় বাধা দেওয়ায় দক্ষিণ প্রতাপপুরের মাহবুব হোসেন বুলবুলকেও পিটিয়ে জখম করা হয়।

শুধু বালু উত্তোলনই নয়, রয়্যালটির নামেও চলছে হরিলুট। সরকারি হারের চেয়ে প্রতি ফুট বালুতে ৭-৮ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া ডোবাড়ী ও লেঙ্গুড়া ইউনিয়নে ‘ইউনিয়ন ট্যাক্স’-এর নামে প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে লাঠিয়াল বাহিনী। বৈধ রশিদ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীদের পুনরায় টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, না দিলে জুটছে লাঞ্ছনা।

স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তাদের ভাষ্যমতে, দিনের বেলা মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান চললেও রাতের চিত্র ভয়াবহ। সন্ধ্যার পর থেকে শত শত টর্চলাইটের আলো আর হাজারো ড্রেজারের শব্দে পিয়াইন নদী হয়ে ওঠে এক বিভীষিকাময় এলাকা। শ্রমিকদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ২-৩ কোটি টাকার বালু অবৈধভাবে পাচার হচ্ছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে এবং মামলাও করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এই সাময়িক অভিযানে কোনো ফল আসছে না। চক্রটি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রতিবারই পার পেয়ে যাচ্ছে।

সরকারের ৩১ কোটি টাকার রাজস্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এলাকাবাসীর প্রশ্ন—এই রাজস্ব কি সাধারণ মানুষের বসতভিটা আর জীবনের চেয়েও বড়? জাফলংয়ের পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই এই অবৈধ ড্রেজার সিন্ডিকেট নির্মূল করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপই এখন গোয়াইনঘাটের মানুষের শেষ ভরসা।

সম্পর্কিত সংবাদ