সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে চোরাই পাথর উদ্ধারে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান এবং জব্দকৃত পাথরের হিসাব নিয়ে ধোঁয়াশার অবসান ঘটেছে। অভিযানে উদ্ধার হওয়া পাথরের পরিমাণ নিয়ে শুরুতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ‘অজ্ঞতা’ প্রকাশ করলেও, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে দাপ্তরিক হিসাবসহ সরকারি চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে। বুধবার (১৪ জুলাই) ইউএনও মোহাম্মদ রবিন মিয়া স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে জব্দকৃত পাথরের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়।
এর আগে মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) অভিযান শেষে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে পাথর জব্দের পরিমাণ বা গাড়ির সংখ্যা জানতে চাওয়া হলে ইউএনও মোহাম্মদ রবিন মিয়া তা জানেন না বলে এড়িয়ে যান। প্রশাসনের এমন লুকোচুরি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে স্থানীয় মহলে তীব্র সমালোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বুধবার সরকারি নথিটি সামনে আসে।
এদিকে সিলেট জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের একটি চিঠি (স্মারক নং- ০৫.৪৬.৯১২৭.০০১.০৬.০২৯.২৬.৯১৯, তারিখ: ১৪ জুলাই ২০২৬) থেকে জানা যায়, ১৩ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার কলাবাড়ী এলাকায় এই টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হয়।
ইউএনও স্বাক্ষরিত ওই চিঠির তথ্যমতে, অভিযানে মোট ২,২০০ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ১. উৎমা ছড়ার ৮০০ ঘনফুট বোল্ডার পাথর, সাদা পাথরের ৪০০ ঘনফুট বোল্ডার পাথর এবং সাদা পাথর ও উৎমা ছড়ার ১,০০০ ঘনফুট ভাঙা পাথর।
চিঠিতে ইউএনও উল্লেখ করেন, অতীতে জব্দকৃত পাথর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় রাখা হতো, যা প্রায়ই রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যেত। ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাত। এই চুরি রোধে এবার জব্দকৃত আস্ত পাথরগুলো উপজেলা পরিষদের পাশে নদীর বাঁধে ডাম্পিং করা হয়েছে এবং ভাঙা পাথরগুলো সরাসরি উপজেলা পরিষদের সামনে রাখা হয়েছে।
সরকারি চিঠিতে পাথরের এমন সুনির্দিষ্ট বিবরণ থাকলেও অভিযানের পরদিন সাংবাদিকদের কাছে কেন ইউএনও তথ্য গোপন করেছিলেন, তা নিয়ে এলাকায় জনমনে ক্ষোভ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, মঙ্গলবার সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে এই অফিশিয়াল হিসাব সামনে আনা হয়েছে। তবে অভিযানে ব্যবহৃত দুটি হাইড্রলিক ট্রাকের মধ্যে একটি ট্রাক (প্রায় ৫০০ ঘনফুট পাথরসহ) গায়েব হওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি চিঠিতে।
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রবিন মিয়া জানান, ‘আমি জেলা প্রশাসকের কাছে জব্দ হওয়া পাথরের হিসাব লিখিতভাবে পাঠিয়েছি। যতটুকু পাথর জব্দ করা হয়েছিল, ঠিক ততটুকুই উপজেলা পরিষদের সামনে রয়েছে।’
এক ট্রাক পাথর গায়েব হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘জব্দ করা পাথর উদাও হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ আমি নিজে, এসিল্যান্ড এবং থানার ওসির গাড়ির মাঝখানে জব্দ করা পাথরের গাড়িগুলো ছিল। আমরা স্কট দিয়ে গাড়িগুলো নিয়ে এসেছি। পাথর গায়েবের খবরটি ভিত্তিহীন।’
তথ্য প্রদানে বিলম্বের বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেন, ‘আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা, আমার অনেক কাজ থাকে। সাংবাদিকরা যখন ফোন করেছিলেন তখন আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ছিলাম। তাই তখন তথ্য দিতে পারিনি, পরে দিয়েছি।’
এদিকে মঙ্গলবার (১৩ জুন) সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা জানিয়েছিলেন, ইউএনওর তথ্য না জানা বা তথ্য লুকোচুরির বিষয়টি তারা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছেন। সরকারি চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর এখন জেলা প্রশাসন নিখোঁজ পাথর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন কোম্পানীগঞ্জবাসী।
