গোয়াইনঘাট ও সালুটিকরে নৌ-পথের ইজারা দুর্নীতি
একুশে সিলেট ডেস্ক
গোয়াইনঘাট ও সালুটিকর অঞ্চলের নৌ-পথের ইজারা নিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজের মধ্যে চলমান আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড় নিয়েছে।
রোববার আদালতে বিআইডব্লিউটিএ-এর পক্ষ থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন করার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তারা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসে। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ফোনের পরই বিবাদী পক্ষ সমঝোতার পথে হাঁটে। ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সিলেট আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) অ্যাডভোকেট শামীম সিদ্দিকী জানান, মামলাটিতে বাদী পক্ষ কৌশলে সরকারকে বিবাদী না করে শুধু বিআইডব্লিউটিএ-কে বিবাদী করেছে। এতে সরকারের স্বার্থ সরাসরি উপস্থাপনের সুযোগ সীমিত হয়েছে।
তিনি বলেন, যেহেতু মামলায় বড় অঙ্কের রাজস্ব জড়িত, তাই অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের মনোনীত আইনজীবী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে নির্ধারিত দিনে শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয়নি।
আদালত পাড়ায় গুঞ্জন রয়েছে, শুনানির প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ফোন পাওয়ার পর বিআইডব্লিউটিএ তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে। ফলে বাদী মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে বিবাদীপক্ষের পরোক্ষ সমঝোতার কারণে পূর্বের স্থগিতাদেশ বহাল থাকার পথ সুগম হয়েছে। এতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়ে সরকারের কয়েক কোটি টাকার টোল ও রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মন্ত্রীর ফোনের বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন বলেও জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান ইজারাদারকে সুবিধা দিতেই বিআইডব্লিউটিএ সময়ক্ষেপণ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও পরে ‘উপর মহলের’নির্দেশে তারা আবেদন প্রত্যাহার বা শুনানি না করার সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে বর্তমান ইজারাদার আরও কিছু সময় টোল আদায়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
রোববার শুনানি না হওয়ায় মামলার পরবর্তী কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এতে গোয়াইনঘাট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বালু ও পাথর মহাল এবং নৌ-ঘাটের ইজারা কার্যক্রমও ঝুলে গেছে। একদিকে বাদী পক্ষের ৫৬ লাখ টাকার ক্ষতির দাবি, অন্যদিকে সমঝোতার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রতিবছর এই এলাকার নৌঘাট ইজারা দিয়ে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের কথা থাকলেও, বারবার হোচট খাচ্ছে সরকারের পলিসি। পক্ষান্তরে সফল হচ্ছে সিন্ডিকেট।
এবারও স্বল্পমূল্যে লীজ নিতে আদালতের দ্বারস্থ হলো মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজ। তাদের লীজকৃত নৌঘাট থেকে শুল্ক আদায় করতে না পারার কারন দেখিয়ে পুনরায় তাদের সাথে সমন্বয় করে আবারও গোয়াইনঘাটের একটি ঘাটকে লীজের দাবি জানান মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজ। এমন পরিস্থিতিতে আবারও বড় ধরনের রাজস্ব বঞ্চিত হওয়ার পথে সরকার। এসব কর্মকান্ডের সাথে জড়িত স্বয়ং নৌ পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের লীজ গ্রহীতা ও অভ্যন্তরিন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের গোপন সমঝোতায় আদালতকে ব্যবহার করে আবারও স্বল্প মূল্যে নৌঘাট ইজারা নেওয়ার পায়তারায় লিপ্ত রয়েছে সিন্ডিকেটটি। এসব কাজে সাহায্য করছে স্বয়ং রাষ্ট্রের নিয়োগকৃত অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন। তিনি রাষ্টের পক্ষে আইনী লড়াই করার কথা। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মামলার লড়াইয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি বিশেষের সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন, যা তার নীতিবিরোধী কর্মকান্ড হিসেবে দেখছেন অন্যান্য আইনজীবিরা।
অপরদিকে, রক্ষকদের ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় খনিজ সম্পদে ভরপুর এই এলাকা থেকে সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব আদায়তো দুরের কথা সেখানে ন্যায্য রাজস্ব পাওয়াটাও হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।
লীজ গ্রহিতার ক্ষতিপূরণ মামলার ৪ নং বিবাদী মো. শরিফুল ইসলাম (উপ-পরিচালক সিলেট আঞ্চলিক অফিস) রোববার রাষ্ট্র পক্ষে এই মামলার শুনানি করার কথা থাকলেও , তিনি শুনানী সম্পন্ন করার পরিবর্তে উল্টো সময় প্রার্থনা করেন। ফলে আগামী ২৮ এপ্রিল এই নৌঘাটের টেন্ডার আহবান প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্থ হয়। এরফলে গোয়াইনঘাট ও সালুটিকর অঞ্চলের নৌ-পথের ইজারা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ এবং মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজের আইনি বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে।
রোববার (২৬ এপ্রিল) আদালতে বিআইডব্লিউটিএ-এর পক্ষ থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন করার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তারা পিছু হটেছে।
সিলেট আদালতের জিপি অ্যাডভোকেট শামীম সিদ্দিকী জানান, মামলাটিতে বাদী পক্ষ সুকৌশলে সরকারকে বিবাদী না করে শুধু বিআইডব্লিউটিএকে বিবাদী করেছে।
তিনি বলেন, বাদী মামলায় এক ধরণের কৌশল নিয়েছেন। তারা সরকারকে বিবাদী করেননি। ফলে সরকারের স্বার্থ সরাসরি উপস্থাপনের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। তবে যেহেতু এখানে বড় অংকের রাজস্ব জড়িত, তাই আমাকে অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষের মনোনীত আইনজীবী বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। রোববার শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তারা রহস্যজনক কারণে শুনানি করেননি।
ওইদিন শোনানীর পর আদালতপাড়ায় জোর গুঞ্জন শুরু হয়-রোববার শুনানির প্রস্তুতি থাকলেও একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ফোনে বিআইডব্লিউটিএ তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে। অর্থাৎ বাদী মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজের সাথে বিবাদীপক্ষের এই পরোক্ষ সমঝোতায় পূর্বের স্থগিতাদেশ বহাল থাকার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে এবং সরকার কয়েক কোটি টাকার টোল ও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। মন্ত্রীর ফোনের বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমান ইজারা গ্রহিতাকে অবৈধ সুবিধা দিতেই বিআইডব্লিউটিএ সময়ক্ষেপণ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, বিআইডব্লিউটিএ-এর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শুরুতে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও হঠাৎ ‘উপর মহলের’নির্দেশে আবেদন প্রত্যাহার বা শুনানি না করা মূলত ইজারাদারকে আরও কিছু সময় টোল আদায়ের সুযোগ করে দেওয়া। রোববার শুনানির কথা থাকলেও বিবাদী পক্ষ পিছু হটায় মামলার পরবর্তী কার্যক্রম ঝুলে গেল। ফলে গোয়াইনঘাট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বালু ও পাথর মহাল এবং নৌ-ঘাটের ইজারা কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, মেসার্স এম এইচ এন্টারপ্রাইজ এর পক্ষে প্রোঃ গোয়াইনঘাট উপজেলার মো. মনিরুল করিম এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ,পরিচালক বন্দর ও পরিবহন বিভাগ, বিআইডব্লিউটিএ-জেলা ঢাকা এর চেয়ারম্যানের পক্ষে উপপরিচালক (ইজারা) বিআইডব্লিউটিএ-জেলা ঢাকা, এবং উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সিলেট আঞ্চলিক দপ্তরকে বিবাদী করে মামলা দায়ের করেন মো. শরিফুল ইসলাম উপপরিচালক সিলেট আঞ্চলিক অফিস।
রোববার যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতে উক্ত মামলার ৪ নং বিবাদী মো. শরিফুল ইসলাম (উপ-পরিচালক সিলেট আঞ্চলিক অফিস) আবশ্যকীয় কাগজের মূল কপি সংগ্রহ করতে না পারার কারন উল্লেখ করেন। এ কারনে তিনি শুনানীর প্রস্তুতি গ্রহন করতে পারেন নাই উল্লেখ করে আদালতে সময় প্রার্থনা করেন।
বাদি তার আবেদনে দাবি করেন, সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার বাউরবাগ হইতে রানীগঞ্জ গ্রামের ডকিনদী পর্যন্ত, গোয়াইন নদী ও চেঙ্গেরখাল নদীর উভয় তীরে উঠানামকৃত বালু-পাথরের শুল্ক ও নৌযান সমূহের বর্ধিত চার্জ আদায় কেন্দ্র হতে বাদি পক্ষ লীজ হোল্ডার হিসেবে ২৪৫ দিন শুল্ক আদায় করতে না পারায় ৫৬ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন, দাবি করেন। উক্ত টাকা প্রাপ্তির দাবিতে এবং ২০২৫-২৬ বছরের লীজের হার অনুসারে অথবা ৫ শতাংশ বর্ধিত হারে সমন্বয়ক্রমে বাদি পক্ষকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বৈধ লীজ প্রদানের নির্দেশনামূলক আদশের প্রার্থনা করেন। এছাড়া আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য লীজ প্রদান করতে না পারেন, সেই আলোকে ওই বছরের টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রচারের সকল কার্যক্রম যাতে করতে না পারে, এইমর্মে নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনাসহ অন্যান্য আইনসঙ্গ উপকারের প্রার্থনা করা হয়।
Leave a Reply