শাহ আরফিনে পাথর লুটে সিন্ডিকেটের রাজত্ব

শাহ আরফিনে পাথর লুটে সিন্ডিকেটের রাজত্ব

পাথর লুটে অভিযুক্ত আজিম, সাজন, নুরুদ্দিন। ছবি সংগৃহীত

স্টাফ রিপোর্টার

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরফিন এলাকায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, একাধিক অভিযান এবং মন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করেও থামছে না অবৈধ বালি-পাথর উত্তোলন ও পাচার। বরং অভিযোগ উঠেছে—একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে রাতের আঁধারে পাথর লুটের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ আরফিনের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে গভীর রাতে ট্রাক্টরভর্তি পাথর উত্তোলন করে পূর্ব নারাইনপুর হয়ে সীমান্তের নিকট দিয়ে ভুলাগঞ্জ গুচ্ছগ্রামে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে অস্থায়ীভাবে পাথর মজুত করে পরবর্তীতে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি রাতের বেলায় সম্পন্ন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলে। নির্দিষ্ট রুট, নির্দিষ্ট সময় এবং সমন্বিত পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ায় এটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে— ছুরাবের পুত্র আজিম, ছুফান মিয়ার পুত্র শৈবাল শাহরিয়ার সাজন এবং জালাল মিয়ার পুত্র নুর উদ্দিন। তারা সবাই ভুলাগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের পাশ দিয়ে পাথর উত্তোলন ও পরিবহন করে আসছে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানা থাকলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সখ্যতার অভিযোগও শোনা যায়। ফলে এদের বিরুদ্ধে মামলা হয় না বললেই চলে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন অভিযুক্তরা।

শৈবাল শাহরিয়ার সাজনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। বরং আমি শাহ আরফিনে পাথর উত্তোলনের বিরোধিতা করি।

নুর উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, আমার এলসি ব্যবসা রয়েছে। শাহ আরফিন এলাকার পাথর ব্যবসার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই।

অপর অভিযুক্ত আজিমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি বর্তমানে হাসপাতালে আছি। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলবো।
তবে মুঠোফোনে তার পাশে থাকা ব্যক্তিকে পাথর-সংক্রান্ত আলাপ করতে শোনা যায়।

রাতের বেলায় পাথরবাহী ট্রাক্টর চলাচলের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।

কালাসাদেক বিওপি ক্যাম্পে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা খবর পেয়েছি বর্ডারের পাশে পাথর উত্তোলণ হচ্ছে আমারা এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যাবস্থা নেব।

অন্যদিকে, ভুলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুর মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় আমরা যেতে পারি না , তবে আমার ফাড়ির সামনে দিয়ে কোন পাথর গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেলে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, ভুলাগঞ্জ গুচ্ছগ্রামে মজুত করা এসব পাথর পরবর্তীতে ট্রাকে করে সরাসরি ভুলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির সামনের সড়ক ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই এসব ট্রাক চলাচল করলেও তা আটকে দেওয়া হচ্ছে না—যা নিয়ে জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ ও প্রশ্ন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযান সাময়িকভাবে কার্যক্রম কমালেও কিছুদিন পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ ও উদ্বেগ। এখন প্রশ্ন—কাদের ছত্রছায়ায় চলছে এই পাথর লুটের সিন্ডিকেট, আর কেনই বা তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না?

চলবে………..

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.




© All rights reserved ©ekusheysylhet.com
Design BY DHAKA-HOST-BD
weeefff