র্যাঙ্কিংয়ে সর্বোচ্চ সাত, বাংলাদেশের সেরা অর্জন
একুশে সিলেট ডেস্ক
পঞ্চম দিনের সকাল। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তখন চাপা উত্তেজনা। গ্যালারিতে দর্শকরা নিঃশ্বাস আটকে বসে আছেন। মাঠে পাকিস্তান তখনও স্বপ্ন দেখছে। রিজওয়ান ও সাজিদ খান ক্রিজে। জয়ের জন্য দরকার ১২১ রান, বাংলাদেশের দরকার মাত্র তিনটি উইকেট।
তারপর একে একে সব শেষ হয়ে গেল। তাইজুলের বল। সাজিদ আউট। রিজওয়ান আউট। এবং শেষে খুররাম শাহজাদের ক্যাচ যখন তানজিদ হাসান তামিমের হাতে নিরাপদে জায়গা করে নিল, সিলেটের আকাশ ফেটে পড়ল উল্লাসে।
৭৮ রানে পাকিস্তানকে হারিয়ে ২-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। সঙ্গে লেখা হলো একটি নয়, একসঙ্গে বেশ কয়েকটি ইতিহাস।
যে ইতিহাসগুলো একদিনে লেখা হলো:
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন একটি দিন আগে আসেনি।
ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে এর আগে কখনো টেস্ট সিরিজ জেতেনি বাংলাদেশ। আজ সেই অপেক্ষার অবসান হলো। পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জয়ের নতুন রেকর্ড গড়ল শান্তর দল। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে আর কোনো দলের বিপক্ষে এত ম্যাচ পরপর জিততে পারেনি টাইগাররা। দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। এবার ঘরের মাঠেও একই স্বাদ। পাকিস্তানকে টানা দুই সিরিজে হোয়াইটওয়াশ।
এবং সবচেয়ে বড় পুরস্কার এলো ম্যাচের পরেই। আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে দুই ধাপ লাফ দিয়ে সপ্তম স্থানে উঠে এলো বাংলাদেশ। টেস্ট ইতিহাসে এটাই সেরা র্যাঙ্কিং। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান দুই দলকেই পেছনে ফেলে। ২০১৮ সালে আটে উঠেছিল বাংলাদেশ, আজ তার এক ধাপ উপরে।
ভিত গড়েছিলেন লিটন ও মুশফিক
এই জয়ের গল্পটা শুধু পঞ্চম দিনের নয়। ম্যাচের প্রথম দিন থেকেই ভিত তৈরি হচ্ছিল।
প্রথম ইনিংসে লিটন দাসের ব্যাট থেকে এলো ১২৬ রানের রাজকীয় ইনিংস। তাঁর ওপর ভর করে ২৭৮ রান তুলল বাংলাদেশ। তারপর বাংলাদেশি বোলারদের তোপে পাকিস্তান মাত্র ২৩২ রানে গুটিয়ে গেল। ৪৬ রানের লিড পেয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নামল বাংলাদেশ।
এবার এলেন মুশফিকুর রহিম। একে একে উইকেট পড়লেও মুশফিক অবিচল। ১৩৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে দলকে ৩৯০ রানে নিয়ে গেলেন। মুশফিকের সেই ইনিংসই পাকিস্তানের সামনে তুলে দিল ৪৩৭ রানের পর্বত।
তাইজুলের জাদু, পাকিস্তানের পতন
পাকিস্তান লড়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই। বাবর আজম ও শান মাসুদ মিলে ৯২ রানের জুটি গড়েছেন। রিজওয়ান ও সালমান আগা মিলে দাঁড় করিয়েছেন ১৩৪ রানের প্রতিরোধ। কিন্তু প্রতিটি প্রতিরোধের দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন একজন মানুষ। তাইজুল ইসলাম।
বাবরকে সরালেন লিটনের ক্যাচে। অধিনায়ক শান মাসুদকে ৭১ রানে ফেরালেন দুর্দান্ত ক্যাচে। সালমান আগাকে বোল্ড করলেন নতুন বল হাতে পেয়ে। পরের বলেই হাসান আলীকে শূন্য রানে ঘরে পাঠালেন। পঞ্চম দিনে সাজিদকে সরিয়ে পূর্ণ করলেন ইনিংসে পঞ্চম উইকেট। আর ম্যাচের শেষ উইকেট হিসেবে খুররাম শাহজাদকে থামিয়ে নিজেই টানলেন ইনিংসের ষষ্ঠ উইকেটের দড়ি।
দ্বিতীয় ইনিংসে একাই ৬ উইকেট। টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৮তম বার ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট। তাইজুল ইসলাম আজ নিজের সেরা সংস্করণে ছিলেন।
রিজওয়ান লড়লেন, তবু হারলেন
পাকিস্তানের পক্ষে মোহাম্মদ রিজওয়ান ৯৪ রান করে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছেন। ১৬৬ বলে ১০টি চারে সাজানো সেই ইনিংস অনেকক্ষণ পাকিস্তানের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সেঞ্চুরির দরজায় দাঁড়িয়ে শরীফুল ইসলামের বলে মিরাজের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। তাঁর বিদায়ের সঙ্গেই পাকিস্তানের শেষ আশাটুকুও নিভে গেল। শান মাসুদ করেছেন ৭১। কিন্তু দলকে বাঁচাতে পারেননি কেউ।
সিলেটের আকাশে নতুন পতাকা
খুররাম শাহজাদের ক্যাচ যখন তানজিদের হাতে স্থির হলো, গোটা দল দৌড়ে ছুটলেন মাঠের মাঝখানে। সিলেটের গ্যালারি গর্জে উঠল। বাংলাদেশের পতাকা উড়তে লাগল আকাশে।
নাজমুল হোসেন শান্তর দল আজ শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি। একটি যুগের মাইলফলক পার হয়েছে। পাকিস্তানকে নিজের মাঠে সিরিজে হারানো, টানা চার টেস্ট জেতা, আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে সর্বোচ্চ সাত নম্বরে ওঠা। এসব একদিনে হয় না।
কিন্তু আজ হলো।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় সিলেটের এই দিনটির নাম লেখা থাকবে সোনার হরফে।
Leave a Reply