বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার–গোলাপগঞ্জ) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। এখন পুরো এলাকার দৃষ্টি এক জায়গায়—ব্যালট বাক্স। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এর আগে ২২ জানুয়ারি শুরু হওয়া টানা নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয় ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটায়। প্রচারণা থামতেই আসনজুড়ে নেমে এসেছে নীরবতা, তবে সেই নীরবতার আড়ালে চলছে তীব্র হিসাব–নিকাশ আর চাপা উত্তেজনা।
২৩৪ নম্বর এই সংসদীয় আসনের এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। প্রকাশ্য প্রচারণা, দলীয় প্রতীক কিংবা মাঠের শক্তির বাইরেও এবার বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক পরিচয়, নীরব ভোটব্যাংক এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত। ফলে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দিতে পারছেন না কেউই।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৯২টি। এর মধ্যে গোলাপগঞ্জে ১০৩টি এবং বিয়ানীবাজারে ৮৯টি কেন্দ্র রয়েছে। মোট ভোটকক্ষ সংখ্যা ১ হাজার ১৩টি। মোট ভোটার ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৩ জন—এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৩৮ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ১৫৫ জন।
প্রচারণা পর্বে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে ঐক্যের বার্তা দিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। দলীয় ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক, একাত্তরের শক্তির নীরব সমর্থন এবং জোটগত ঐক্য—সব মিলিয়ে তিনি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাস্টিং ভোটের একটি বড় অংশ ধানের শীষের ঝুলিতে যেতে পারে। তবে আঞ্চলিক মেরুকরণ এই সমীকরণ কতটা বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সেলিম উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এই নির্বাচনকে ‘মর্যাদার লড়াই’ হিসেবে দেখছেন। বিয়ানীবাজারের সন্তান হিসেবে আঞ্চলিক পরিচয়কে সামনে রেখে তিনি উঠান বৈঠক, পথসভা ও ব্যক্তি যোগাযোগে বিশেষ গুরুত্ব দেন। দলীয় ভোট ধরে রাখার পাশাপাশি নিরপেক্ষ ভোটার এবং আওয়ামী ঘরানার একটি অংশকে আকৃষ্ট করার কৌশলও নিয়েছেন তিনি। পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জামায়াতের ভোট আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এই আসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বিএনপি জোটের বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী জমিয়ত নেতা হাফিজ মাওলানা মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। হেলিকপ্টার প্রতীকে তিনি উলামা সমাজের একটি বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন বলে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রিভার বেল্ট এলাকায় তার প্রভাব দৃশ্যমান। বিয়ানীবাজার পিএইচজি মাঠে ফুলতলী মসলকের ওয়াজ মাহফিলকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক এবং বাধা দেওয়ার ঘটনা ভোটের হাওয়ায় প্রভাব ফেলেছে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। ফলে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি কার্যকর ‘ভোট-কাটার’ ভূমিকায় উঠে এসেছেন।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুন নূর (লাঙ্গল) নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পুরোনো প্রতীক ও ব্যক্তিগত পরিচিতিকে পুঁজি করে মাঠে ছিলেন। গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী এডভোকেট জাহিদুর রহমান (ট্রাক) জোটে থাকলেও এই আসনে স্বতন্ত্রভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের একটি অংশ এই দুই প্রার্থীর দিকেও যেতে পারে।
এবারের নির্বাচনে আঞ্চলিক সমীকরণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ধানের শীষের প্রার্থীর বাড়ি গোলাপগঞ্জে হলেও বাকি চার প্রার্থীর বাড়ি বিয়ানীবাজারে। ফলে ‘নিজ উপজেলার প্রার্থী’ ভাবনা ভোটের অঙ্কে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।
সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ফ্যাক্টর হিসেবে আলোচনায় রয়েছে নৌকা প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগের নীরব ভোটব্যাংক। প্রকাশ্যে অবস্থান না নিলেও শেষ মুহূর্তে তাদের সিদ্ধান্ত পুরো ফলাফলের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে সিলেট-৬ এর নির্বাচন কোনো সরল দ্বন্দ্ব নয়। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হেলিকপ্টার—এই তিন প্রতীকের মধ্যেই কাস্টিং ভোটের বড় অংশ ভাগ হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশিষ্ট ভোট যাবে অন্যান্য প্রার্থীদের ঝুলিতে।
প্রচারণা শেষ। এখন সব হিসাব–নিকাশ থেমে আছে ভোটের দিনে। শেষ পর্যন্ত প্রতীক, আঞ্চলিকতা না কি নীরব ভোট—কোনটি নির্ধারণ করবে বিজয়ী, তার উত্তর মিলবে ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বাক্স খোলার পরই।
Leave a Reply