সিসিক ও গৃহায়নের প্রকৌশলীদের ‘মধুচন্দ্রিমা’: উপশহরে অনিয়মই যখন নিয়ম!

সিসিক ও গৃহায়নের প্রকৌশলীদের ‘মধুচন্দ্রিমা’: উপশহরে অনিয়মই যখন নিয়ম!

নিজস্ব প্রতিবেদক
সিলেটের অভিজাত এলাকা শাহজালাল উপশহর। যেখানে প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে প্রয়োজন হয় সরকারি অনুমোদনের কড়া নজরদারি। কিন্তু উপশহরের এফ-ব্লকের ১ নং রোডের ২০ নং প্লটে যা ঘটছে, তা রূপকথাকেও হার মানায়। কোনো বৈধ নথিপত্র ছাড়া যে নির্মাণকাজ স্বয়ং প্রধান প্রকৌশলী এসে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই কাজই আবার শুরু হয়েছে পূর্ণদমে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—আইনের চেয়েও কি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ‘খুঁটির জোর’ বেশি?

অনুসন্ধানে জানা যায়, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক অনুমোদন ছাড়াই এই প্লটে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে সম্প্রতি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী নেজামুল হক মজুমদারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। কোনো অনুমোদন ছাড়াই বিশাল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই কঠোর অবস্থানের আয়ু ছিল মাত্র একদিন। ২৪ ঘণ্টা পার হতেই সব ‘ম্যানেজ’ হয়ে যায় এবং পুনরায় চালু হয় নির্মাণকাজ।

ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নকশার মেয়াদ থাকে সর্বোচ্চ ২ বছর। অথচ ২০ নং প্লটের ভবন মালিকপক্ষ আল-মামুন মুর্শেদ স্বাক্ষরিত ২০১৪ সালের একটি পুরনো নথিপত্র ব্যবহার করে ২০২৫ সালে এসে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন। ১১ বছর আগের একটি মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজ দিয়ে কীভাবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এলাকায় নির্মাণকাজ সম্ভব, তা নিয়ে খোদ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা এখন কাঠগড়ায়।

সিটি কর্পোরেশনের ২২ নং ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইসমাইল আহমেদ দাবি করেছেন, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাগজ দেখানোর পরই তারা নকশা অনুমোদন দিয়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, সিসিক কর্তৃপক্ষ কি সেই মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজের সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি? অন্যদিকে, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী শুরুতে কঠোর হলেও এখন বলছেন, “কাগজপত্র জমা দিয়ে কাজ শুরু করেছে।” যেখানে একটি ভবনের বৈধ অনুমতি পেতে সাধারণ মানুষের ৩ থেকে ৪ মাস সময় লাগে, সেখানে মাত্র একদিনে কীভাবে সব নথিপত্র বৈধ হয়ে গেল—এ যেন এক প্রশাসনিক ‘জাদু’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ঠিকাদার জানান, পুরো নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। লন্ডনী মালিক প্রবাসে থাকার সুবাদে সিলেটের এক প্রভাবশালী ঠিকাদার এই অবৈধ নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, জাল নথিপত্র তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনাকে সরাসরি “টাকার খেলা” হিসেবে অভিহিত করছেন।

নকশা পরিবর্তন করে এবং নিয়ম না মেনে কাজ চলায় ভবনটির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সঠিক তদারকি ও সয়েল টেস্টের নিয়ম না মেনে গড়ে ওঠা এই বহুতল ভবনটি ভবিষ্যতে বড় কোনো দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা।

সিলেটের সচেতন মহলের দাবি, এই ‘ওপেন সিক্রেট’ অনিয়মের পেছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চতর তদন্ত প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তবে উপশহরের মতো পরিকল্পিত জনপদগুলো অচিরেই বিশৃঙ্খল বস্তিতে পরিণত হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.




© All rights reserved ©ekusheysylhet.com
Design BY DHAKA-HOST-BD
weeefff